ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির রাজনীতিতে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতা মোঃ মাহফুজুর রহমান পুষ্প। দলের দুঃসময়ে মামলা, হামলা ও কারাভোগের শিকার নেতাকর্মীরা উপেক্ষিত থাকলেও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিএনপিতে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। নিজের রাজনৈতিক জীবনের ৩৪টি মামলা, তিন দফায় ১৮ মাস কারাভোগ এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় বাবাকে হারানোর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন তিনি।
রবিবার (১ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে এসব কথা উল্লেখ করেন পুষ্প। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পৌর বিএনপির প্রচার সম্পাদক।
পোস্টে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা তুলে ধরে পুষ্প জানান, বিএনপির দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ৩৪টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। তিন দফায় তাকে ১৮ মাস কারাভোগ করতে হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকা, ব্যবসা-বাণিজ্য হারানোসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাকে রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে।
তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ২০১৫ সাল। ওই বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় তার বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পরও তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি। পরে বাবার মরদেহ কারাগারে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। রাত ১০টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বাবার জানাজার নামাজে অংশ নিলেও শেষবারের মতো বাবার কবরে মাটি দিতে পারেননি তিনি। জীবনের এই অপূরণীয় বেদনা আজও তাকে তাড়িত করে বলে জানান পুষ্প।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলের জন্য এত ত্যাগ, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের পরও যদি নেতাকর্মীরা যথাযথ মূল্যায়ন না পান, তাহলে তাদের ত্যাগের মূল্য কোথায়?
ফেসবুক পোস্টে পুষ্প অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি এখন বিএনপিতে জায়গা করে নিচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে নির্যাতন ও কারাভোগের শিকার হওয়া নেতাকর্মীরা সাংগঠনিকভাবে অবহেলিত হচ্ছেন।
দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তার দাবি, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত কিছু নেতার কর্মকাণ্ডে ত্যাগী নেতাকর্মীরা হতাশ ও বিব্রত। ঘুষ, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুষ্পের ভাষায়, মামলা ও নির্যাতনের সময় ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রয়োজন হয়, অথচ রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতার ভাগাভাগির সময় তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। তাহলে রাজনীতি কি আদর্শ ও ত্যাগের, নাকি কেবল সুবিধা অর্জনের মাধ্যম?
তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের প্রতি অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে যারা মামলা-হামলা সহ্য করেছেন, কারাভোগ করেছেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সাংগঠনিক স্বীকৃতি ও যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে পুষ্প বলেন, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি বিএনপিকে ভালোবাসেন এবং দলের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন এবং সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসন অব্যাহত থাকলে একসময় অভিমান নিয়ে দল থেকে সরে দাঁড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।
পোস্টের শেষাংশে তিনি উল্লেখ করেন, তার এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তার মতো অসংখ্য ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীর মনের কথা। অনেক কর্মীর হাতে গাড়িভাড়া না থাকলেও তারা মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন এবং দলের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন।
পুষ্পের বক্তব্য, তারা দল ছেড়ে যেতে চান না, তবে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েও রাজনীতি করতে চান না।
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন ও দলীয় অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
আজকালের খবর/বিএস