মঙ্গলবার ● ৩ নভেম্বর ২০২৬
নাশকতা ঠেকাতে মহাসড়কে বিএনপির শান্তিপূর্ণ অবস্থান
মজুরি বোর্ড গঠনকে শ্রমিক আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখছেন শ্রমিক নেতারা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম   (ভিজিট : ০)
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের পোশাক শ্রমিকদের টানা কয়েক দিনের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পুলিশের গাড়িতে আগুন, পুলিশ বক্স ভাঙচুর, যানবাহনে হামলা ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় জনজীবন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সহিংসতা ও নাশকতা প্রতিরোধ এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও শিল্পাঞ্চলে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। 

অন্যদিকে সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে শ্রমিক আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখছেন ৩৫টি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারা শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার সকালে কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে ভোগড়া বাইপাস, নাওজোড় ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা জানান বিএনপির নেতারা।

এদিকে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি এবং গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমানও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন। নাওজোড়, ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও বোর্ডবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মহাসড়কের পাশে অবস্থান করেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, শ্রমিক পরিচয়ে একটি পক্ষ কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধা দিচ্ছে এবং আন্দোলনে অংশ নিতে উসকানি দিচ্ছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে সড়কে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য তারা মাঠে রয়েছেন।

কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন গাজীপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার ড. ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী। অন্যদিকে গাজীপুরের শালনায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন গাজীপুর মেট্রো সদর থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান এলিস, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও সদর মেট্রো থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. হাসান আজমল ভূঁইয়া, মহানগর জিয়া পরিষদের সভাপতি অ্যাভভোকেট সাইফুল ইসলাম মোল্লা, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব মাহমুদ হাসান রাজু,  সদর মেট্রো থানা যুবদলের আহবায়ক নাজমুল খন্দ্কার সুমনসহ  বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। 

বিএনপি নেতারা বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। সরকারও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের সঙ্গে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, কারখানা ভাঙচুর কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায় এবং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানান।
গত কয়েক দিনে গাজীপুরের চন্দ্রা, মৌচাক, সফিপুর, কোনাবাড়ী, নাওজোড়, ভোগড়া ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় কয়েক দফায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং কোনাবাড়ীতে পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের অনেকে আহত হন। সহিংসতার কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। দীর্ঘ যানজটে পড়ে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েক ডজন পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও শিল্পকারখানার আশপাশে পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ ও শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ৩৫টি শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত শ্রমিক মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ, গাজীপুর। মঙ্গলবার গাজীপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তারা একে শ্রমিকদের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ও বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে বুধবার থেকে কাজে ফেরার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি তমিজ উদ্দিন তনু বলেন, দেশের অর্থনীতি ও শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষায় কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে যারা পুলিশের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করেছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো বহিরাগত বা স্বার্থান্বেষী মহল যাতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে শ্রমিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শফিউল আলম বলেন, সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডের ওপর আস্থা রেখে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব। জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য মজুরি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়ন না চালিয়ে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্য শ্রমিক নেতারাও বলেন, শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। তাদের দাবি, এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকেরা জড়িত নন; বহিরাগত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং মহাসড়কে জনদুর্ভোগ-সব মিলিয়ে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে আন্দোলনের অর্জন হিসেবে দেখছেন শ্রমিক নেতারা, অন্যদিকে সহিংসতা ও নাশকতা প্রতিরোধে মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা এবং শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রধান প্রত্যাশা।

আজকালের খবর/বিএস 







আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft