
মধুমতি নদীর বুকে নৌকাবাইচ, দুই তীরে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস আর ঢাকঢোলের শব্দে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল মাগুরার মহম্মদপুর। বাইচালদের সম্মিলিত ‘হেইওরে, হেইওরে’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর চারপাশ। ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে মাগুরা, ফরিদপুর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা থেকে আসা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় মহম্মদপুর ব্রিজঘাট ও আশপাশের এলাকা।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে মহম্মদপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধুমতি নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মহম্মদপুর মধুমতি নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা’। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। মইমুর আলী মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রোববার দুপুর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে মধুমতি নদীর দুই তীরে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে নদীর পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর বাইচালদের সম্মিলিত ‘হেইওরে, হেইওরে’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পছন্দের নৌকাকে সমর্থন জানিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে প্রতিযোগিতা।
এবারের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় মোট ১২টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
নৌকাবাইচের পাশাপাশি বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় মাছ-মাংস, মিষ্টি, চানাচুরসহ নানা খাবারের দোকান, গ্রামীণ পণ্য, শিশুদের মাটির খেলনা, নারীদের প্রসাধনসামগ্রী এবং নাগরদোলাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন ছিল। সুদৃশ্য তোরণ ও বাহারি দোকানে সাজানো মেলাপ্রাঙ্গণে কেনাকাটা ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মেলাকে কেন্দ্র করে কেনাবেচা বেড়েছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য জমজমাট হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী নৌকাবাইচ উপভোগ করেন এবং পরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এ সময় তিনি বলেন, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এ আয়োজন এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করবে। সরকার দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি-কালচারকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো আরও বেশি আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
আয়োজকেরা জানান, শতবর্ষের বেশি সময় ধরে চলে আসা এ আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি এলাকার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। ভবিষ্যতেও প্রতিবছর একই দিনে নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
মধুমতি নদীর বুকে নৌকাবাইচ, দুই তীরে মানুষের উচ্ছ্বাস আর গ্রামীণ মেলার প্রাণবন্ত পরিবেশে দিনটি পরিণত হয় এক আনন্দঘন উৎসবে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আয়োজকেরা আশা প্রকাশ করেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ ঐতিহ্য টিকে থাকবে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব