
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে কোনাবাড়ীতে ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে কয়েকজন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। গতকাল রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ বোর্ড গঠন করে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট একই দিন প্রকাশ করা হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে আটটার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর, মৌচাক, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আশপাশের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
সকাল ১০টার দিকে কোনাবাড়ী এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কোনাবাড়ী ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। মহাসড়কে চলাচলকারী কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
খবর পেয়ে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৮ থেকে ১০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও ভোগড়া বাইপাসসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজিবি সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে। প্রয়োজনে সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।
এদিকে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, রোববারই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হবে।
মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মন্ত্রী অভিযোগ করেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের ব্যবহার করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। মজুরি বোর্ডকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি হতে দেওয়া হবে না বলে জানান মন্ত্রী।
শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন অরাজকতা বন্ধ করে শ্রমিকেরা কাজে ফিরে যাবেন বলে তিনি আশা করছেন।
এর আগে শনিবার রাতেও কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রোববার সকালে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।
শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন মজুরি বোর্ডের সুপারিশে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমিক-মালিকপক্ষের মতামত এবং শিল্পের সক্ষমতা কতটা গুরুত্ব পায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান পোশাকশিল্পাঞ্চল। এ অঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল এবং পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। সহিংসতার পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি বা পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তবে তদন্তের আগেই কোনো পক্ষকে দায়ী না করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব