বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও ঢাল। কিন্তু মানবসৃষ্ট দূষণে এবার বনটির বাতাসেও মিলেছে বিপজ্জনক অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র বস্তুকণ‘। এটি বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সুন্দরবন’আমাদের প্রকৃতি,জীববৈচিত্র,বনজ,জলজ প্রাণী, নদূ ও বৃহৎ বনজ সম্পদ সমৃদ্ধ ও মৎস্য সম্পদের আধাঁর সর্বোপরি প্রাণ প্রবাহের অন্যতম উপাদান ‘অক্স্রিজেন ’তৈরির কারখানা। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় ‘ঢাল’ হিসেবে সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি,পর্যটন,মৎস্য খাতে উল্লেখ যোগ্য অবদান রেখে আসছে। অথচ এখন মানুষই হয়ে ‘সুন্দরবনের অন্যতম শত্রু। সেই মানুষই অক্স্রিজেন তৈরীর কারখানায় উপর্যপুরি ক্ষত বিক্ষত করে চলছে। এসব বহুবিধ কারণে আজ বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ‘অবৈধ দখল,অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ, ইঞ্জিন চালিত ফিসিং বোট,জ্বালানী তৈল,খাস্যসামগ্রী,নির্মাণ সামগ্রী বহনকারি জাহাজের কালো ধোঁয়া, পোড়া মবিলসহ অন্যান্য বর্জ্য নিক্ষেপ করায় দুষিত হয়ে পড়ছে এর বাতাস,পরিবেশ। পরিনামে সুন্দরবনের বাতাস,পরিবেশ,প্রতিবেশ,জীববৈচিত্র, গাছ পালা,,মৎস্য সম্পদ,সকল প্রকারূ জলজ প্রাণীর জন্য হুমিকী হয়ে পড়ছে।
পরিবেশ, প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে প্রতিনিয়ত অবৈধ ভাবে বন নিধন, হরিণ ও মৎস্য শিকার ও গাছে আগুন দিয়ে মুধু আহরণ,অবৈধ দখল দূষণ, অপরিকল্পিত হোটেল,মোটেল রিসোর্টসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মানের কারণে সুন্দরবনকে হুমকীতে ফেলছে। শুধু এর একটি দিক নিয়ে অর্থাৎ বাতাস দূষণ সর্ম্পকে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ওঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। ঐ গবেষণায় সুন্দরবনের কয়েটি স্থানে মানমাত্রার চেয়ে বেশি অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ এবং ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ১০ পাওয়া গেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের খুলনা, সাতক্ষীরা, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের পানিতে শুধু নয়, বাতাসেও লবণাক্ততা আছে। সেটির সঙ্গে যখন পিএম ২.৫-এর মতো দূষিত পদার্থ যোগ হয়, তখন গাছপালা, মৌমাছি, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই গবেষণাটি করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। সুন্দরবনের প্রাণী, বায়ু, মাটি, পানি ও বৃক্ষসম্পদ তথা সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক প্রথম এই বেজলাইন স্টাডি (ভিত্তিমূলক সমীক্ষা) করা হয়। এর অংশ হিসেবে বায়ুপরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হয়। তথ্য বলছে, সুন্দরবনের শরণখোলার রেঞ্জের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫ পাওয়া গেছে ১০২ মাইক্রোগ্রাম; আর পিএম ১০ পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বাতাস চাঁদপাই রেঞ্জের। সেখানে প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫ পাওয়া গেছে ৮৯ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০ পাওয়া গেছে ৯৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম।
বায়ুদূষণনিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫–এর উপস্থিতি ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা অস্বাস্থ্যকর। আর পিএম ১০ প্রতি ঘনমিটারে ৪৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে সেটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে ২০২১ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, পিএম ২.৫ প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে সেটি অস্বাস্থ্যকর বাতাস। পিএম ১০ এর জন্য বিশ্ব সংস্থাটির নির্ধারিত মাত্রা ও দেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মাত্রা একই। তবে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০ এর বাইরে পাওয়া সালফার ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এই গবেষণার একজন গবেষক সিআইজিইএসের পরিবেশবিশেষজ্ঞ মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, গবেষণায় আমরা অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫–এর পরিমাণ বেশি পেয়েছি শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে। পশুর চ্যানেল, চাঁদপাইয়ে জাহাজ থেকে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও কয়লা খালাস করা হয়। খালাসের সময় যে ধুলা তৈরি হয়, সেটিই অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতির কারণ হতে পারে।
পশুর নদের তীর ঘেঁষে সিমেন্ট কারখানাগুলোর নিজস্ব জেটিতে ক্লিংকার খালাস করা হয়। অন্যদিকে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা কয়লা খালাস করা হয় পশুর চ্যানেলে। এতে বলা হয়, শুষ্ক মৌসুমে অনেক সময় ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেলে সুন্দরবনের ধুলার পরিমাণ বাড়ে। সেই সঙ্গে এ মৌসুমে আন্তদেশীয় (ট্রান্সবাউন্ডারি) দূষণও চলে আসে সুন্দরবনের ওপর দিয়ে। সুন্দরবনের দূষণের পেছনে সেটিরও একটি ভূমিকা আছে। জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নথিতে বাংলাদেশের বায়ুদূষণে আন্তমহাদেশীয় দূষণের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ২১ শতাংশ।
সুন্দরবনের বায়ুমান নিয়ে প্রথমবারের মতো করা এ গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, পরিবেশগত দিক থেকে সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, যা লবণাক্ততাসহ অন্যান্য বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। বায়ুদূষণের মাত্রা মাঝারি হলেও তা উদ্ভিদের ওপর বিদ্যমান সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মাটি ও জোয়ারের পানিতে পুষ্টি উপাদানের প্রবেশ ও সরবরাহের ধরন বদলে দিতে পারে। এ গবেষণায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার বায়ুদূষণের একটি প্রাথমিক স্থানভিত্তিক চিত্র পাওয়া গেছে। তবে সময়ের সঙ্গে দূষণের মাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তার চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। এ জন্য ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ জরুরি।
গবেষণায় পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, পিএম ২.৫ ও সালফার ডাই-অক্সাইডকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এই উপাদানের বিস্তার যথাযথভাবে বুঝতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি ও দিক এবং বৃষ্টির মতো আবহাওয়াগত উপাদানগুলোও ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। প্রত্যাশা থাকবে, সুন্দরবনকে রক্ষায় অবৈধ দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি জাহাজ, শিল্পকারখানা ও পর্যটন স্থাপনার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সুন্দরবনে নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণই পারে ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমাতে।
লেখক: সম্পাদক, ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
আজকালের খবর/বিএস