আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে সংঘাত যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন তার সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় সাধারণ নিরাশ্রয় মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাটি বিশ্ব বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ১২ জন নিরীহ মানুষ, যার মধ্যে রয়েছেন ২ জন প্রবাসী বাংলাদেশী এবং পবিত্র ওমরাহ পালনে আসা সাধারণ যাত্রী। এছাড়া আহত হয়েছেন ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ।
বিবিসি (BBC) ও আল জাজিরা (Al Jazeera)-সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বিমানবন্দর বা বেসামরিক স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে যখনই এ ধরনের সহিংস হামলা সংঘটিত হয়, তখনই কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক দোষারোপের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—এই রক্তের দায় শেষ পর্যন্ত কার? যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের উত্তাপ যখন রণক্ষেত্র ছাড়িয়ে বেসামরিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়, তখন ধর্মীয় যাত্রী, প্রবাসী শ্রমিক এবং নিরপরাধ সাধারণ মানুষের জীবন সংকটময় হয়ে ওঠে।
যে প্রবাসীরা পরিবারের রুটি-রুজির সংস্থান করতে কিংবা পবিত্র ওমরাহ পালনের মাধ্যমে পূণ্য অর্জন ও হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজতে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাদের এমন অকাল ও করুণ মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের উপর যে কোনো হামলা একটি মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোনো ভূ-রাজনৈতিক বৈরীতা কিংবা সামরিক কৌশলই নিরীহ জীবনের রক্তপাতকে বৈধতা দিতে পারে না।
এখনই সময় এসেছে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের চক্র বন্ধ করার। কোনো এক পক্ষকে একক দোষারোপ করে বা নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুঙ্কার দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; বরং তা পরিস্থিতিকে আরও অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে ঠেলে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষার্থে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অবিলম্বে এগিয়ে আসা উচিত। আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং সংঘাতরত সকল পক্ষকে অবিলম্বে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ন্ধ করে কূটনৈতিক টেবিল বা আলোচনায় বসতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হাসপাতাল এবং বেসামরিক আবাসস্থলকে সব ধরনের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে রাখার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।
বিবিসি, আল জাজিরাসহ বিশ্বের শীর্ষ গণমাধ্যম এবং জাতিসংঘকে এই মানবিক সংকটের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার চাপ বজায় রাখতে হবে।
যুদ্ধ ও সংঘাত কখনো কোনো টেকসই সমাধান এনে দিতে পারে না; এটি কেবল শোকার্ত পরিবার এবং হারানো প্রাণের দীর্ঘশ্বাস বাড়ায়। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বকে অতি দ্রুত এই অযৌক্তিক সংঘাত বন্ধের কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে হবে, যেন আর কোনো প্রবাসী শ্রমিক বা ওমরাহ যাত্রীকে স্বজনদের ছেড়ে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো শান্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সদিচ্ছা প্রয়োজন।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
আজকালের খবর/বিএস