মঙ্গলবার ● ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংঘাতের মাঝেও শান্তির প্রত্যাশা বিশ্বনেতাদের
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১২ পিএম   (ভিজিট : ২২)
পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় টালমাটাল অবস্থা এবং অস্থিরতা,অশান্তির দাবানল ক্রমশ মানুষ,অর্থনীতি একই সঙ্গে দেশ ,ভূখন্ড,মানচিত্রকেও হুমকীতে ফেলছে। চলমান এই ব্যবস্থা কখনো মানুষ,অর্থনীতি,দেশ,মানচিত্র,ভূখন্ডের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবেনা।  বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা  বিভাদমান বিরোধ,বিভেদ,সংঘাত,সহিংসতা,যুদ্ধ,যুদ্ধাবস্থা বন্ধে বিশ্ব মঞ্চে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের আহ্বান,গুরুত্বারোপ করা হলেও বাস্ততে কার্যক্ষেত্রে তা বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। 

এমনি প্রেক্ষাপটে বিভাদ, বিরোধ,যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতার পথ পরিহার করে শান্তি,সমঝোতা,সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবার আহ্বান এবারও  ধ্বণিত হয়েছে জাতিসংঘের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ পরিষদের অধিবেশন থেকে।এও বলা হয়েছে,যুদ্ধ,সংঘাত,অস্ত্র খাতে ব্যায়িত অর্থ মানবতার কল্যাণে তথা বিশ্বের ক্ষুধার্ত,অনাহারি,রোগাক্রান্ত মানুষের জন্য ব্যয় করা। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় অর্থ সহাতার আহ্বান জানানো হয়। 

তবে এই অধিবেশনে অংশ নেয়া কোন কোন দেশের প্রতিনিধিরা পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে‘রূপান্তর’ বলে আখ্যা দিলেও কেউ কেউ বলেছেন,‘এটি রুপান্তর নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থা ভাঙনের লক্ষণ।’ একই সঙ্গে এসব আলামত হচ্ছে,অন্যের সম্পদ কূক্ষিতগত করা, অযাচিত ও অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দসহ কেই কেউ এমন মন্তব্য করেছেন। জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, বড় শক্তিগুলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে সরে গিয়ে ক্রমেই অন্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ব্যবস্থার গতিপথ বদলে গেছে। অর্থনৈতিক সংযুক্তি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি হলো ‘জাতিসংঘ সনদ।’ কিন্তু সেটিও এখন উপেক্ষিত। তিনি বলেন, তাঁর দেশ আরও বেশি ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনের পথে এগোবে। একক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও নতুনদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিনযুক্ত ,চীন,রাশিয়া,ভারত,বাংলাদেশের বক্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক। এ কারণে এই দেশে সমূহের বক্তব্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বশান্তি ও যুদ্ধ-সংক্রান্ত প্রদত্ত বক্তব্যে ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, অন্যরা যখন শান্তির কথা বলেছে, তখন তাঁর প্রশাসন বাস্তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ইরান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।

ট্রাম্প জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে দীর্ঘদিনের জটিল সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। 

এ ছাড়াও জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কূটনীতি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তবে রাশিয়া, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের বক্তব্যে অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল কিছুটা ভিন্নতা।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও সমান নিরাপত্তার নীতি মানতে হবে। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোরও কথা বলেন এবং ভারতের স্থায়ী সদস্যপদকে সমর্থন জানান। 

 চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জাতিসংঘ অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও সাম্প্রতিক বক্তব্যে যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে ব্রিকসকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের পরিপন্থী। 

 ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জাতিসংঘের অধিবেশনে বলেন, সংঘাত শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, শান্তি এবং উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করছে। যুদ্ধের প্রভাব সংঘাতের বাইরে থাকা দেশগুলোর ওপরও পড়ছেÑবিশেষ করে যেসব দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা কম। তাই শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য কার্যকর বহুপক্ষীয় উদ্যোগের প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের অবসানে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন।’ তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, যুদ্ধ শুধু প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়াচ্ছে না, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। 

 চার দেশের বক্তব্যে পথের পার্থক্য থাকলেও একটি অভিন্ন বার্তা স্পষ্টÑযুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সামরিক শক্তির বদলে কূটনীতি, সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যেই খুঁজতে হবে।

বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্টা ও অর্থনেতিক,জলবায়ু পরির্বতন জনিত ঝুঁকি নিরসনে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছোট রাষ্ট্র, মধ্যম শক্তি ও বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক জোট গড়ে তুলতে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে পারস্পরিক বিশ্বাস,আস্থা,সহমর্মিতা,সহযোগিতা,সমঝোতা,আলোচনাপরিধি ক্রমশ বাড়ানো এবং এই অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করার কাজও অব্যাহত রাখতে হবে। এমনি অবস্থায়ও প্রত্যক্ষ হচ্ছে ‘কেউ কেউ দ্বিপক্ষীয় ,বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মাঝে আরও উঁচু দেয়াল তুলতে এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে যেতে চাইছে। এটা স্থির বিশ্বাস যে, পারস্পরিক সম্পর্কের ‘দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বই একমাত্র শান্তি,সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার পথ’ নিহিত রয়েছে। 

বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান অস্থিরতা প্রমাণ করছে, একক শক্তি বা সামরিক প্রতিযোগিতা স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাই হতে পারে নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করে ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সম্পাদক,ক্লাইমেট জার্নাল ২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম। 









Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft