সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো খাতের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিল্প, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। এর সঙ্গে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় চাপ যুক্ত হওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতির গতিÑসব ক্ষেত্রেই এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা।
সারের ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য, দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে; কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠের চিত্র সব সময় সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের সার না পাওয়ার অভিযোগ, সার নিয়ে বিক্ষোভ এবং কোথাও কোথাও গুদাম থেকে সার লুটের খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছেÑদেশে সার থাকলেও কৃষকের হাতে সময়মতো তা পৌঁছাচ্ছে না কেন? কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে মোট সারের চাহিদা প্রায় ৬৭ দশমিক ৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ দশমিক ২০ লাখ, ডিএপি ১৩ দশমিক ৫০ লাখ, এমওপি ৯ দশমিক ৭০ লাখ, টিএসপি ৯ দশমিক ০১ লাখ এবং অন্যান্য সার ৯ দশমিক ২১ লাখ টন।
অন্যদিকে দেশের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১১ দশমিক ০৬ লাখ টন সার উৎপাদন করেছে। একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। অর্থাৎ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মোট চাহিদার মাত্র প্রায় ১৭ শতাংশ পূরণ হয়েছে। বার্ষিক চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি সার আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। সরকারের হিসাবে আবার সংকটের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায়। অক্টোবর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত পাঁচ মাসে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির চাহিদা ধরা হয়েছে ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ টন। এর বিপরীতে ৫১ দশমিক ৭১ লাখ টন সরবরাহের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সরবরাহ চাহিদার চেয়ে ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ টন বেশি।
এখানেই মূল প্রশ্ন। কাগজে সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও মাঠে কেন কৃষককে সার খুঁজতে হচ্ছে? অর্থাৎ শুধু উৎপাদন বা আমদানির হিসাব নয়, সার পরিবহন, মজুত, ডিলার পর্যায় এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনাও সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্যাস সংকটে শিল্পের চাকা ধীর:
সারের পাশাপাশি গ্যাস সংকটও শিল্প খাতে বড় চাপ তৈরি করেছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প ও বিদ্যুৎÑদুই খাতেই। সাম্প্রতিক হিসাবে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে বলে তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্প। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টি বন্ধ থাকার তথ্য এসেছে। টিকে গ্রুপেরও বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা এডিবল অয়েল রিফাইনারি, আরএকে সিরামিকস, গাজীপুরের মাহমুদ ডেনিমস ও মাহমুদ ফেব্রিকস অ্যান্ড ফিনিশিংসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে সংকটের প্রভাব বেশি। কোথাও কোথাও উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্যও রয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব বিদ্যুতেও:
গ্যাসের সংকট শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল সরবরাহে সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সব কেন্দ্র একই সময়ে চালানো যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭-১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ও অন্যান্য সমস্যায় প্রয়োজনীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু উৎপাদনক্ষমতার সংকট বলা যাবে না। বরং এটি কার্যকর উৎপাদন এবং জ্বালানি সরবরাহের সংকট।
ব্যাংক খাতেও বাড়ছে চাপ:
এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চাপ যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংক খাতে মোট আমানত ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৯৬ লাখ কোটি টাকা এবং বিতরণ করা ঋণ প্রায় ১৭ দশমিক ৩৪ লাখ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ব্যাংকের ঋণের বড় অংশই আসে জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়লে তা শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না; আমানতকারী, বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তাই আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
সব মিলিয়ে সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা যুক্ত হয়ে অর্থনীতির ওপর চতুর্মুখী চাপ তৈরি করেছে। কৃষিতে সার না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, গ্যাস না থাকলে শিল্পের চাকা থামবে, জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে, আর ব্যাংক ঋণের সংকট বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিত করবে। তাই সংকট মোকাবিলায় শুধু সাময়িক সরবরাহ বাড়ানো নয়, উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার জরুরি। কারণ মানুষের স্বস্তি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এখন সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
লেখক: মোতাহার হোসেন, সম্পাদক,ক্লাইমেট জার্নাল ২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
আজকালের খবর/বিএস