কিশোরদের বখাটেপনা বা আচরণগত সমস্যা রোধে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, সঠিক parenting বা অভিভাবকত্ব এই সংকট উত্তরণে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিশোরদের বিপথগামিতা রোধে মা-বাবার করণীয় এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশের সফল উদাহরণ আলোচনা করা হলো।
# মা-বাবার করণীয় :
* বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মুক্ত যোগাযোগ:
কিশোর বয়সে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় হুকুম বা কঠোর শাসনের পরিবর্তে বন্ধুর মতো তাদের কথা শুনতে হবে, যাতে তারা নিজেদের অনুভূতি ও সমস্যা আপনাদের সাথে খোলামেলা শেয়ার করতে পারে।
* সময় দেওয়া ও উপস্থিতি নিশ্চিত করা:
কর্মব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় রাখুন। তাদের সাথে ডিনার করা, উইকেন্ডে ঘুরতে যাওয়া বা তাদের শখের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা মা-বাবার প্রতি তাদের আস্থা বাড়ায়।
* ইতিবাচক ও গঠনমূলক শাসন:
অতিরিক্ত কঠোরতা বা অতিরিক্ত ঢিলাঢালা ভাব—দুটিই ক্ষতিকর। শাসন হতে হবে গঠনমূলক, যেখানে ভুলের জন্য শাস্তির চেয়ে ভুলের কারণ বুঝিয়ে দেওয়া এবং সঠিক পথ দেখানোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
* সঙ্গ দোষ ও ডিজিটাল ব্যবহারের ওপর নজরদারি:
সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কার সাথে আড্ডা দিচ্ছে সেদিকে সূক্ষ্ম নজর রাখুন। পাশাপাশি, তাদের ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহারের একটি স্বাস্থ্যকর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিন এবং সাইবার বুলিং বা পর্নোগ্রাফি আসক্তি থেকে তাদের দূরে রাখুন।
* নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা:
পরিবার থেকেই সততা, শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। মা-বাবা নিজেরাও যদি ভালো আচরণের মডেল হন, তবে সন্তানরা তা সহজেই অনুকরণ করবে।
* ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখা:
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন বা সমাজসেবামূলক কাজে তাদের যুক্ত করুন। অতিরিক্ত অবসর বা একঘেয়েমি অনেক সময় কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়।
#বিভিন্ন দেশের সফল উদাহরণ:-
* ফিনল্যান্ড (ফিনীয় মডেল):
ফিনল্যান্ডে স্কুল পর্যায়ে শাস্তি বা অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার সংস্কৃতি নেই। এর বদলে সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, ইতিবাচক পারিবারিক সম্পর্ক এবং খেলাধুলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কোনো কিশোর আচরণগত সমস্যায় পড়লে পরিবার ও স্কুল যৌথভাবে খুব নরমহাতে থেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনে।
* জাপান (শৈশব থেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধ):
জাপানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং নিজেদের কাজ নিজেরা করার শিক্ষা দেওয়া হয়। কোনো কিশোর বিপথগামী হলে তাদের অপরাধী হিসেবে না দেখে সমাজ ও পরিবারের যৌথ তত্ত্বাবধানে একটি শোধনাগার বা সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়, যেখানে তাদের অনুশোচনা ও দায়িত্ববোধ শেখানো হয়।
* আইসল্যান্ড (আইসল্যান্ডিক মডেল - Youth in Iceland):
১৯৯০-এর দশকে আইসল্যান্ডে কিশোরদের ধূমপান, মাদক ও বখাটেপনা খুব বেড়ে গিয়েছিল। সরকার তখন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়—মা-বাবার সাথে কিশোরদের সময় কাটানো বাধ্যতামূলক করতে বিভিন্ন পারিবারিক উৎসব, স্পোর্টস ক্লাব ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ভর্তিতে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া শুরু হয়। রাতে কার্ফু জারি করা হয় এবং কিশোরদের জন্য ফ্রি ক্লাব অ্যাক্টিভিটি চালু করা হয়। এর ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে কিশোর অপরাধের হার বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
মোদ্দাকথা, কিশোর বয়সটা আবেগের। একটু সহানুভূতি, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিবিড় পরিচর্যা পেলে যেকোনো বিপথগামী কিশোরকে সুন্দর ও দায়িত্বশীল নাগরিকে রূপান্তর করা সম্ভব।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও সমাজকর্মী, ঢাকা
আজকালের খবর/বিএস