বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধিকার রক্ষার এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব যেভাবে অভ্যন্তরীণ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থান দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করেছে। এই দুই গণঅভ্যুত্থান ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার চিরন্তন প্রেরণা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবন এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই দিনটি নতুন করে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার এক অনন্য ও প্রাসঙ্গিক উপলক্ষ।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রকে বহুমুখী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, তীব্র খাদ্যাভাব, ভঙ্গুর অবকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালনাকে ভীষণ কঠিন করে তোলে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় এক আমূল রূপান্তর ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান ও গণজাগরণ বাংলাদেশের রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হলে সামরিক বাহিনীতে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে তাকে মুক্ত করা হয়। এই অভূতপূর্ব ঘটনাপ্রবাহে সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সংহতি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। তবে ৭ নভেম্বরের এই সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে এর সামরিক মনস্তত্ত্ব, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ইতিহাসের এমন পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নই একটি জাতিকে ভবিষ্যতের সঠিক ও নিরাপদ পথ দেখাতে পারে।
এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাসে যার পরিচয় বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার মহান ঘোষক এবং পরবর্তী সময়ে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ও সফল রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে তিনি মুক্তিকামী জনতাকে উজ্জীবিত করেন এবং পরবর্তীতে 'জেড ফোর্স'-এর অধিনায়ক হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অনন্য অবদান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে জিয়াউর রহমান উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষির আধুনিকায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তার সময়কালে দেশব্যাপী গণমুখী খাল খনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির প্রসারে যুগান্তকারী সব উদ্যোগ নেওয়া হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে তিনি যে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন, তা বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে আলোচিত। একই সাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে তার সরকার অত্যন্ত উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। তার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রভূত সাফল্যের পাশাপাশি সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও ইতিহাসের অংশ। একজন ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়কের সামগ্রিক মূল্যায়নে তার বিশাল অর্জন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনগণের সম্মিলিত স্বার্থকে কেন্দ্র করে তিনি এই রাজনৈতিক দর্শন সামনে আনেন। তার দৃষ্টিতে জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ছিল একটি স্বাধীন দেশের অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশাগত পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার ধারণা তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই দর্শনের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনী সাফল্য দলটির সাংগঠনিক বিস্তার ও জনসমর্থনের প্রতিফলন ঘটায়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে দলটির গণভিত্তি বিস্তৃত হয়।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বে দলটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করে। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত রাখেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়া। পরবর্তী সময়েও তিনি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা বিএনপির ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দলের নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২১০টি আসন লাভ করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে আসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতির পর এই ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বও অনেক বেশি।
বর্তমান বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে গাজীপুরের মতো শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আবাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষা করে একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার নিজের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলার কথাও স্মরণ করতে চাই। গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রানী বিলাসমনি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এই জনপদের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি । ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হই। গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন আমার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে গাজীপুর জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, হামলা, কারাবরণ, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহকর্মীদের রক্ত ঝরতে দেখেছি। রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থাকার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে রাজনীতি কখনো ব্যক্তিগত পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয়; রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং দেশের কল্যাণে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার দায়িত্ব। আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, ত্যাগ, সততা ও কর্মের মাধ্যমে। দলের সুসময়ে যেমন দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন, তেমনি দুর্দিনে নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।
আজকের বাংলাদেশে ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হলো-জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা, রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করা এবং জনগণের অধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠা করা। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতা, দমন-পীড়নের পরিবর্তে আইনের শাসন এবং বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে ৭ নভেম্বরের ইতিহাসও যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসকে দলীয় প্রচারণার সংকীর্ণতায় আবদ্ধ না রেখে এর ঘটনাপ্রবাহ, অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষা নিয়ে মুক্ত আলোচনা জরুরি।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের বর্তমান নেতৃত্ব বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, জনগণের আস্থা ও ভালোবাসাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ, ত্যাগ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী। তাই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ধারণ করে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একটি উন্নত, মানবিক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
৭ নভেম্বর হোক জাতীয় ঐক্যের প্রেরণা, গণতন্ত্রের অঙ্গীকার এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয়ের দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস অমর হোক।
লেখক: অ্যাড. মেহেদী হাসান এলিস, সভাপতি, গাজীপুর সদর মেট্রো থানা বিএনপি, সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, গাজীপুর জেলা ছাত্রদল।
আজকালের খবর/বিএস