পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সময়। এই সময়টিতে মনোবিজ্ঞানীদের মতে অভিভাবকদের আচরণ হওয়া উচিত অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, ধৈর্যশীল এবং ইতিবাচক। ফলাফল যেমনই হোক না কেন, সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মবিশ্বাসকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া উচিত। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফলাফল প্রকাশের পর অতিরিক্ত তিরস্কার বা চাপ প্রয়োগ করলে শিক্ষার্থীর মধ্যে হীনম্মন্যতা, ভয় এবং মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে। এর পরিবর্তে অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে এই বার্তা দেওয়া যে, একটিমাত্র পরীক্ষার ফলাফল বা প্রাপ্ত নম্বর তাদের পূর্ণাঙ্গ মেধা, যোগ্যতা বা ভবিষ্যৎ জীবনের একমাত্র নির্ধারক হতে পারে না। সন্তান ভালো ফলাফল করলে তার কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করা এবং তাকে অভিনন্দন জানানো উচিত, তবে সেই সাফল্যের রেশ ধরে তাৎক্ষণিকভাবে পরবর্তী কোনো বড় লক্ষ্য বা উচ্চাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।
অন্যদিকে, ফলাফল প্রত্যাশিত বা কাঙ্ক্ষিত না হলে হতাশ না হয়ে সন্তানের পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়ানোই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। অতীতে কোথায় ভুল হয়েছিল বা প্রস্তুতিতে কী ঘাটতি ছিল তা নিয়ে রাগারাগি না করে বরং গঠনমূলক আলোচনা করা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ মানসিকতার পরিবর্তে সহযোগিতামূলক শিখনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যার ফলে সেখানে ফলাফল কেন্দ্রিয় মানসিক চাপ অত্যন্ত কম এবং অভিভাবকরাও নম্বরের চেয়ে শিশুর সার্বিক বিকাশকে বেশি গুরুত্ব দেন।
একইভাবে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দেন যে, ফলাফল প্রকাশের দিন বা পরবর্তীতে অন্য কোনো প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের সন্তানের ফলাফলের সঙ্গে নিজেদের সন্তানের তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ এই ধরনের তুলনা তরুণ মনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কড়া প্রতিযোগিতামূলক সমাজেও বর্তমানে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপের ক্ষতিকর দিকগুলো উপলব্ধি করে অভিভাবকরা সচেতন হচ্ছেন এবং ফল বিপর্যয়ের পর সন্তানকে মানসিক সমর্থন দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন।
সর্বোপরি , ফলাফল যা-ই আসুক না কেন, সন্তানের প্রচেষ্টা ও চেষ্টার মূল্যায়ন করে তাকে ভালোবাসার ও আস্থার নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করাই হলো প্রকৃত অভিভাবকত্বের পরিচয়, যা একটি শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার গ্লানি কাটিয়ে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
আজকালের খবর/বিএস