করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি, বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘœ বিশ্ববাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি,বাণিজ্যি এমনকি মানুষের কর্মসংস্থানের গতিপথে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এ যুদ্ধে বৈশ্বিক ভাবে জ্বালানী সরবরাহে অনিশ্চয়তা,শৈন শৈন জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি,সারসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ চেইনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ হচ্ছে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত ইরানের ‘হরমুজ প্রণালী ’ এটি আরব সাগরের অংশবিশেষের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্য জ্বালানীতেল এলপিজ,এলএনজি সরবরাহের লাইফ লাইনই হচ্ছে এই ঐতিহাসিক ‘ হরমুজ প্রণালী’। তাই ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধে‘হরমুজ প্রণালী’দিয়ে জ্বলানী তেল,এলপিজি,এলএনজিবাহি জাহাজ চলাচল মারাতœক ভাবে ব্যবহত হচ্ছে। আবার ইরান কর্তৃক মধ্য প্রাচ্যের অপরাপর তৈল সমৃদ্ধ দেশের মাঝে মধ্যে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বিশ্বের জ্বালানীতেল,এলপিজি,এলএনজির বাজারও উর্ধমুখী। এমনি অবস্থায় জ্বালানী নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন,সার,ওষুধ উৎপাদনসহ উৎপাদনমুখী অধিকাংশ শিল্প কারখানার চাকা ঘোরা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে চরম খাদ্য সংকটসহ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, কর্মস্থানের অভাবের মুখে পড়তে হবে। ঠিক প্রায় একই ধরনের আশংকার কথা ওঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায়ও।
সম্প্রতি প্রকাশিত আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে অনুরুপ আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের শিরোনামÑ‘নেভিগেটিং আ প্রিকারিয়াস ওয়ার্ল্ড’। এতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে প্রবৃদ্ধি কমছে, চাপ বাড়ছে মূল্যস্ফীতির। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এই ধাক্কা। সংস্থাটি আরও বলছে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মধ্য মেয়াদে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নানা চ্যালেঞ্জের কারণে ব্যাহত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন ধাক্কা আসবে না, এমনটা ধরে নিলেও ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। তবে সহায়ক রাজস্বনীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগের বদৌলতে অর্থনীতি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে পারে । একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে বিশ্ববাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ৫ শতাংশ। প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তবে চলতি বছর বিশ্ববাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি কমে আসতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যেতে পারে। প্রসঙ্গত: যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাকে (আইইএ) উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে আইএমএফ। তারা বলছে, এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের সরবরাহে; সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
আইএমএফ বলছে, চলমান সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের উৎস বহুমুখী ও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তারা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলার সুযোগ পাচ্ছে। তা হলো দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা কমানো।
আইএমএফ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, অতিরিক্ত ভারসাম্যহীনতার কারণে অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে অর্থনীতিতে হঠাৎ এবং বড় ধরনের পরিবর্তনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এর কেন্দ্রে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। তাদের হিসাবে, ২০২৫ সালে এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আনুমানিক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বেসরকারি খাতে, এআই খাতে বিনিয়োগ দুই ট্রিলিয়ন বা দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।
আইএমএফ শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, এআইয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও আছে। কর্মসংস্থান ও মজুরিতে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন, সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া ও ছাঁটাই হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক ধাক্কা সামলে এখনো প্রবৃদ্ধির মুখ দেখছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এতে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের তৎপরতা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। মধ্য মেয়াদে যে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে, সেই সম্ভাবনা কম। একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো , অন্যদিকে বারবার যেসব ধাক্কা আসছে, সেগুলো সামলানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর কারণ হচ্ছে , বিশ্ব অর্থনীতি এখন একসঙ্গে দুটি বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখিÑএকদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী ঘিরে জ্বালানি ও সরবরাহ সংকট; অন্যদিকে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা। তাই বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য জ্বালানি ও পণ্যের উৎপাদনে বহুমুখীকরণ, মজুত সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ,কর্মসংস্থান জোরদার করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
লেখক: সম্পাদক,ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
আজকালের খবর/বিএস