ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রেরণা। যে জাতি তার সংগ্রামের ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি ভবিষ্যতের পথচলার প্রেরণা হারায়। টংক আন্দোলনের মহানায়ক, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কমরেড মণি সিংহের জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী কমরেড মণি সিংহ মেলা।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ৬ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা। ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর একই সময়ে সাত দিনব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত এ মেলা কেবল একজন নেতাকে স্মরণের আয়োজন নয়; বরং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার উপলক্ষ।
কমরেড মণি সিংহ ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর শৈশবেই মা সরলা দেবীর সঙ্গে নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে চলে আসেন। স্কুলজীবন থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
১৯২৮ সাল থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ব্রিটিশ শাসনামলে তাঁকে কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কিন্তু কোনো দমন-পীড়নই তাঁকে আদর্শ ও সংগ্রামের পথ থেকে সরাতে পারেনি।
মণি সিংহের জীবনসংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কৃষক-খেতমজুরের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি নিজের মামাদের জমিদার পরিবারের স্বার্থের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মা সরলা দেবী ছিলেন সুসং দুর্গাপুরের জমিদার পরিবারের অংশীদার। সেই পারিবারিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তিনি শোষিত কৃষকের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেন।
কৃষকের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি পাটের ন্যায্যমূল্যের দাবি তোলেন। এ কারণে তাঁকে দেড় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় বলে বিভিন্ন জীবনী ও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। বর্তমান সময়েও জনস্বার্থের প্রশ্নে ব্যক্তিগত লাভ, আত্মীয়তা কিংবা ক্ষমতাবানদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার শিক্ষা তাঁর জীবন থেকে পাওয়া যায়।
কমরেড মণি সিংহের নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক টংক আন্দোলন। সুসং দুর্গাপুরসহ বৃহত্তর অঞ্চলের কৃষকেরা তৎকালীন জমিদারি শোষণ ও টংক প্রথার কারণে দীর্ঘদিন দুর্ভোগের শিকার হন। এ ব্যবস্থায় কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিদারকে দিতে হতো। ফসল কম হলেও সেই দায় কমত না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ফসলহানির সময় কৃষকদের দুর্দশা আরও বাড়ত।
এই অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করতে মণি সিংহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষকেরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হন। এ আন্দোলনে হাজংসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কৃষকের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতন সত্ত্বেও কৃষকেরা সংগ্রাম চালিয়ে যান।
টংক আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক দাবির আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল জমিদারি শোষণ, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কৃষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় টংক প্রথা বিলুপ্তির পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে মণি সিংহের অবদান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর সংগ্রামী জীবন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তানি শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে এবং বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। পাকিস্তান আমলে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল এবং তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণার কথাও বিভিন্ন জীবনীতে পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠনে দায়িত্ব পালন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে সমর্থন আদায়েও তাঁর ভূমিকা ছিল। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী সংগঠিত করার উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও কূটনৈতিক অবদান জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীনতার পরও তিনি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে থেকে শ্রমিক-কৃষকসহ সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন।
১৯৩৫ সালে তিনি অনিমা সিংহকে বিয়ে করেন। অনিমা সিংহও প্রগতিশীল আন্দোলন ও নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান কমরেড দিবালোক সিংহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সমাজসেবক। ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মণি সিংহ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। পরে তাঁর বাক্শক্তিও হারিয়ে যায়। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এটি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। তাঁর জীবনীসংক্রান্ত কিছু প্রকাশনায় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পদক পাওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরেও শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবিচল ভূমিকা ও মানুষের ভালোবাসা তাঁর জীবনের বড় অর্জন।
কমরেড মণি সিংহ মেলার গুরুত্ব
একজন নেতার স্মরণে মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু স্মৃতিচারণ নয়; তাঁর জীবন, চিন্তা, সংগ্রাম ও আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও এর অন্যতম লক্ষ্য। কমরেড মণি সিংহ মেলার গুরুত্ব এখানেই। এ মেলা টংক আন্দোলন, কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্র হিসেবেও মেলাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্গাপুরের স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংগীতচর্চার বিকাশেও মেলার গুরুত্ব রয়েছে। এর সাংস্কৃতিক আয়োজন বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের জীবন, সংগ্রাম, অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের কথা তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাসচর্চা ও প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশে এ আয়োজন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মণি সিংহের জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্ম শিখতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে স্থান দেওয়ার নৈতিকতা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। তাঁর স্মরণে আয়োজিত মেলা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এসব মূল্যবোধ মানুষের চিন্তা ও কাজে প্রতিফলিত হবে।
কমরেড মণি সিংহ মেলাকে সুষ্ঠু, সুন্দর ও সফল করতে আয়োজকদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। দলীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতার বাইরে রেখে মেলাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলায় পরিণত করতে হবে।
এবারের মেলায় মণি সিংহের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, বই প্রদর্শনী, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং তরুণদের অংশগ্রহণে শিক্ষামূলক আয়োজনসহ নানা কর্মসূচি রাখা হবে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও আদর্শ আরও গভীরভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আসন্ন মেলা উপলক্ষে ২২ অক্টোবর ২০২৬ দুর্গাপুরের কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ডা. দিবালোক সিংহের সভাপতিত্বে সভায় মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, প্রচার-প্রচারণা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেলাকে সফল করতে এ সম্মিলিত উদ্যোগকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
কমরেড মণি সিংহের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক তাঁরাই, যাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেন। কৃষকের পক্ষে পারিবারিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ভূমিকা রাখা তাঁর জীবনজুড়ে রয়েছে ন্যায় ও মানবমুক্তির পক্ষে অবিচল থাকার শিক্ষা।
২০০৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁর জাতীয় অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তবে তাঁর আদর্শের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, সাম্য, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাস্তব জীবনে গুরুত্ব পাবে। তাই কমরেড মণি সিংহ মেলা শুধু অতীতকে স্মরণ করার আয়োজন নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা সঞ্চয়েরও উপলক্ষ।
লেখক: সাংবাদিক ও লোকসাহিত্য গবেষক (বাংলা একাডেমি থেকে লোকসাহিত্য গবেষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত)
আজকালের খবর/বিএস