নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে গাজীপুরের সাফারি পার্ক। এক সময় দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা পার্কটি দিন দিন হারাচ্ছে জৌলুস। একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও নিখোঁজের ঘটনায় কমছে প্রাণীর সংখ্যা। এর সঙ্গে রয়েছে ইজারার বকেয়া, প্রাণীর খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ এবং দর্শনার্থীদের নানা ভোগান্তি।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্কটি শুরুতে দেশি-বিদেশি বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে মিল রেখে পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল। এখানে প্রাণীরা উন্মুক্ত পরিবেশে থাকবে আর দর্শনার্থীরা নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িতে ঘুরে সেগুলো দেখবেন—এমন পরিকল্পনা নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল পার্কটির।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে নানা অনিয়ম আর অবহেলায় কমতে থাকে এর জৌলুস। প্রতি অর্থবছরে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও পার্কের অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পার্কটিতে গত কয়েক বছরে একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহীর মৃত্যু হয়। এর আগেও একটি হাতি মারা যায়।
৫ আগস্টের পর পার্ক থেকে দুটি ম্যাকাও চুরি হয়। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি একটি নীলগাই পার্ক থেকে নিখোঁজ হয়। একই বছরের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি আফ্রিকান রিংটেইল লেমুর চুরি হয়। সবশেষ গত ৬ ও ৭ আগস্ট পরপর দুটি হাতির মৃত্যু হয়।
পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় বিদেশ থেকে ১২টি জিরাফ আনা হয়েছিল। পরে জিরাফগুলো চারটি বাচ্চার জন্ম দেয়। কিন্তু একে একে সব জিরাফ মারা যায়। ২০২৫ সালে মারা যায় সর্বশেষ জিরাফটি। এরপর থেকে পার্কটি জিরাফশূন্য।
২০১৩ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারুও আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে একটি ক্যাঙ্গারু একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। পরে সেগুলোও মারা যায়।
পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট রাতে পাচারকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূর ও দুটি লেমুরসহ বিপুলসংখ্যক পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ও ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন উদ্ধার করা পাখি ও প্রাণীগুলো সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
উদ্ধার হওয়া লেমুর থেকে পরে পার্কে একজোড়া বাচ্চার জন্ম হয়। ২০২২ সালে একটি লেমুর মারা যায়। ২০২৫ সালের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হলে পার্কটি লেমুরশূন্য হয়ে পড়ে।
পরে ওই বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে চুরি হওয়া একটি পুরুষ রিংটেইল লেমুর উদ্ধার করা হয়। বাকি দুটি লেমুর ভারতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। লেমুরগুলো কীভাবে পার্ক থেকে চুরি হয়ে দেশের বাইরে গেল, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ভাওয়ালের শালবনের ৩ হাজার ৮১০ একর ভূমি পার্ক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। একসময় এখানে বিশাল বৃক্ষের সমাহার থাকলেও গাছ চুরি ও পাচারের কারণে বনের গাছপালা কমছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পার্কটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক তপন দের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজ, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে অনিয়ম, বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানিতে অনিয়ম এবং পার্কের জায়গার একটি অংশ বাদ রেখে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। কর্মচারী নিয়োগেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল।
পার্ক প্রতিষ্ঠার পর মূল গেটসহ বিভিন্ন ইভেন্ট ইজারা দেওয়া হলেও বিগত সময়ে ইজারার প্রায় ৮ কোটি টাকা আদায় করতে পারেনি বন বিভাগ। পাওনা টাকা আদায়ে মামলাও করা হয়েছে।
পার্কটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত বন বিভাগ নিজেরাই পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা ও রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পার্কের মূল ফটক ও কোর সাফারি ইজারা দিয়ে বছরে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু করোনার পর থেকে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ার কথা বলে ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। বন বিভাগ নিজেরা পরিচালনা করলেও এসব খাত থেকে বছরে কত টাকা আয় হচ্ছে আর কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রাণীদের খাবারের মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের খাবার সরবরাহের কারণে অনেক প্রাণী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিযোগ। বেশ কয়েক বছর ধরে বাঘ ও সিংহের প্রজননও বন্ধ রয়েছে।
দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধার অবস্থাও ভালো নয়। বিশাল পার্ক ঘুরতে গিয়ে রোদ বা বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ভেতরে খাবারেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক দর্শনার্থী ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পার্ক ত্যাগ করেন।
পার্কের ভেতরে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকারও অভিযোগ রয়েছে। গত ২৯ আগস্ট পার্কের ভেতরে কর্মচারীদের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, কম জনবল নিয়ে পার্ক ব্যবস্থাপনা সত্যিই অনেক কষ্টের। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। ইজারাদার পাওয়া গেলে কাজ করতে সুবিধা হতো।
তবে পার্ক পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম. ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর পার্কের নানা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব কাটিয়ে উঠতে বন বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
একসময় দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় বন্যপ্রাণী পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের সাফারি পার্ক এখন একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি, নিখোঁজ আর অব্যবস্থাপনায় জৌলুস হারাচ্ছে। পার্কটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।
আজকালের খবর/বিএস