সোমবার ● ২ নভেম্বর ২০২৬
কার্তিকেই নতুন ধানের ঘ্রাণ, উত্তরের কৃষকের ঘরে ঘরে ব্যস্ততা
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৯ পিএম   (ভিজিট : ০)
‘অগ্রহায়নের আট, যেখানে মন সেখানে ধান কাট’—উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে প্রচলিত দীর্ঘদিনের এই প্রবাদ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় অগ্রহায়ন মাসের শুরুতে আমন ধান কাটা শুরু হলেও এখন কার্তিক মাসের শুরুতেই মাঠে পাকতে শুরু করেছে আগাম জাতের আমন ধান। পঞ্চগড়সহ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় আগাম আমনের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

একসময় আমন ধান রোপণের পর থেকে অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে তেমন কাজ থাকত না। আশ্বিন-কার্তিক মাসকে অনেকেই অভাবের সময় হিসেবে বিবেচনা করতেন। কাজের সন্ধানে এ সময় অনেক শ্রমিককে অন্য জেলায় যেতে হতো। কিন্তু আগাম জাতের আমন ধান চাষ এবং ধান কাটার পর জমিতে আগাম শীতকালীন শাকসবজি আবাদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। এখন কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগও বেড়েছে।

উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ধান কেটে বাড়িতে তোলাও শুরু হয়েছে। নতুন ধানের গন্ধে কৃষকের বাড়িতে বইছে আনন্দের সুবাস। অনেক বাড়িতে চলছে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা-পুলি তৈরির আয়োজন। অন্যদিকে যেসব জমির ধান এখনো পাকেনি, সেসব এলাকার কৃষকেরা ধান ওঠার অপেক্ষায় দিন পার করছেন।

ধান কাটার পাশাপাশি কাঁচা খড় বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন কৃষকেরা। গো-খাদ্যের চাহিদা থাকায় ধানের কাঁচা খড়ের বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা প্রকৃতিনির্ভর আমন ধান চাষ করে আসছেন। আগে অগ্রহায়ন মাসের শুরুতে ধান কাটা শুরু হলেও এখন আগাম জাতের ধানের কারণে এক থেকে দেড় মাস আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমনের ফলনও ভালো হয়েছে।

এবার মাঠে ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২ ও ৭২, বিনা-৭সহ বিভিন্ন আগাম জাতের ধানের পাশাপাশি ভারতীয় জাতের গুটি পারি ও স্বর্ণা পারি ধান চাষ হয়েছে। কৃষকদের দাবি, পুরোনো জাতের আমন ধানে যেখানে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া যেত, সেখানে আগাম জাতের ধানে ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে।

শুরুতে নতুন ধানের দাম কিছুটা কম হলেও কাঁচা খড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন তাঁরা। এক বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াইয়ের পর কাঁচা খড়ের আঁটি বাজারে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

অনেক কৃষক ধান কাটার পর দ্রুত জমি চাষ দিয়ে শুকিয়ে নিচ্ছেন। কিছুদিনের মধ্যেই এসব জমিতে আগাম জাতের আলু, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। এতে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ জানান, এবার তিনি দুই বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর জমির সব ধান পেকে গেছে। ধানের অবস্থা ভালো হওয়ায় বিঘাপ্রতি ১৯ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে ধান কাটবেন।

তিনি বলেন, বর্ষার শেষ দিকে ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল। এ জন্য জমিতে অনেক টাকা খরচ করে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়েছে। আগের তুলনায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে। ময়দানদিঘী বাজারে নতুন ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা হলে কৃষকেরা ভালোভাবে লাভবান হতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, দুই বিঘা জমির ধান কাটার পর সেখানে আলু ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করবেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

এ বিষয়ে পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, চলতি আমন মৌসুমে পঞ্চগড় জেলায় ১ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ জেলায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কাঁচা ধান বাজারে আসতে শুরু করায় বর্তমানে দাম কিছুটা কম। পুরো মৌসুমে ধান কাটা শুরু হলে এবং মিলাররা ধান কেনা শুরু করলে দাম আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আগাম আমন ধান কাটার পর কৃষকেরা একই জমিতে আলু, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি আবাদ করতে পারবেন। এতে কৃষকের বাড়তি আয় এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব






আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft