অভাবের সংসার, বৃদ্ধ বাবা-মা, কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব। জীবনের শুরুটা তার জন্য সহজ ছিল না। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, থেমে গেছে পড়াশোনার পথও। কিন্তু থেমে যায়নি স্বপ্ন দেখা। হতাশার কাছে হার না মেনে কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর প্রশিক্ষণকে পুঁজি করে নিজের ভাগ্য বদলেছেন ক্ষেতলালের শাকিল তালুকদার (২৯)। একসময় যে তরুণের কাছে সংসারের হাল ধরাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, আজ তিনিই হয়ে উঠেছেন সফল কৃষি ও খামার উদ্যোক্তা। শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেননি, তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছেন একই গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণ।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের শাকিলের এই পথচলা যেন গ্রামীণ জনপদে আত্মনির্ভরতার এক অনন্য গল্প। তার সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ আর সদিচ্ছা থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। শাকিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সংসারে দায়িত্বও ছিল তার কাঁধেই বেশি। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া, পরিবারের ভরণপোষণ এবং নিজের ভবিষ্যৎ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষার পথ দীর্ঘ করা সম্ভব হয়নি। এইচএসসি পাস করার পরই সংসারের প্রয়োজনে উপার্জনের পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। মেজ ভাই একটি দোকানে কাজ করেন, আর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও যথাসাধ্য পালন করছেন শাকিল।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে নিজের জীবনের শেষ কথা বলে মেনে নেননি তিনি। ২০২১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৩ সালে একই অধিদপ্তর থেকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে যুব ঋণ ও অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নিয়ে শুরু করেন ক্ষুদ্র পরিসরে গবাদিপশু পালন।
শাকিলের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তার খামারে ছিল মাত্র দুটি গাভী ও ছয়টি ছাগল। গাভীর দুধ বিক্রি করে ধীরে ধীরে আয় বাড়তে থাকে। সেই আয় থেকে আবার বিনিয়োগ করেন খামারে। এভাবেই একটু একটু করে বড় হতে থাকে তার উদ্যোগ। একসময় যে উদ্যোগ ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা, সেটিই আজ তার পরিবারের আশার আলো হয়ে উঠেছে। বর্তমানে শাকিলের খামারে রয়েছে ১২টি গাভী ও ১০টি ছাগল। পাশাপাশি প্রায় তিন একর জমিতে আখ, মরিচ, টমেটো, ধান, ওলকচু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, লতিরাজ কচুসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল ও শাকসবজির চাষ করছেন তিনি। এ ছাড়া দুটি পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তার এই কৃষি ও খামারভিত্তিক উদ্যোগে বর্তমানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
শাকিলের সাফল্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। তার পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও উদ্যোগ দেখে একই গ্রামের অনেক তরুণ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তাদের কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ মাছ চাষে ঝুঁকছেন, আবার কেউ কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এভাবে শাকিলকে অনুসরণ করে গ্রামের প্রায় ৪০ তরুণ নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছেন।
নাজিরপুর গ্রামের মো. কবির হোসেন, আব্দুল গফুর ও শহীদ আলী বলেন, শাকিলকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। তার পরিকল্পনা ও কাজের ধরন অনুসরণ করে আমরাও সবজি ও মাছ চাষ শুরু করেছি। তাকে দেখে বুঝেছি, চেষ্টা করলে গ্রামেও নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব। শাকিল আমাদের গ্রামের একজন সফল উদ্যোক্তা। তাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।
কৃষি ও খামার পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় শাকিল। তিনি আলমপুর ইউনিয়ন আনসার ও ভিডিপির দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন। নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি সমাজের মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যেও তিনি খুঁজে পান আত্মতৃপ্তি।
গ্রামের মাটিতে গড়ে ওঠা তার খামার ও কৃষি উদ্যোগ যেন একটি বার্তাই দেয়—চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। আর একজন মানুষের সৎ উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা যে একটি গোটা জনপদের তরুণদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, শাকিল তালুকদার তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শাকিলের এই সাফল্যের পেছনে প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, শাকিল অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগিয়েছেন এবং একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমরা তার আরও উন্নতি কামনা করি।
আজকালের খবর/বিএস