মণিরামপুরের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের মূল চালিকাশক্তি কাকুড়িয়া বিল এখন অবরুদ্ধ। আমন মৌসুমে যখন কৃষকদের মাঠে ব্যস্ত থাকার কথা, তখন কাকুড়িয়া বিলের পানি নিষ্কাশনের আকুতি নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুরছেন শত শত প্রান্তিক কৃষক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে মণিরামপুর উপজেলার ভোজগাতি, সদর ও কাশিমনগর—এই তিন ইউনিয়নের বৃষ্টি ও উপরিভাগের পানি প্রাকৃতিকভাবে কাকুড়িয়া বিলে জমা হয়। তবে স্থানীয় ভূমি প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তরের দায়িত্বহীনতার সুযোগে বিলের পানি নিষ্কাশনের সংযোগ খাস খালগুলো দখল করা হয়েছে। সেখানে ১৫০ থেকে ১৮০টি অবৈধ ঘের ও উঁচু মাটির ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিলের প্রায় ৪৫০ হেক্টর আমন ফসলি জমি ও বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা কৃষকদের কোটি টাকার নিট লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিলের ভুক্তভোগী কৃষক নূর ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আঠারো সালের পর থেকে ঘের-ভেঁড়ি শুরু হওয়ায় আমাগের কপাল পুড়েছে। ঘের করে তারা কোটিপতি হলেও আমাগের দিকে কারও খেয়াল নেই।" আরেক কৃষক জাহাঙ্গীর বলেন, "একা তো আর পানি সরানো সম্ভব না। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে আমাগের বাঁচাই দায়।"
প্লাবনভূমির গুরুত্ব তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ.এস.এম মহিউদ্দীন বলেন, "কাকুড়িয়া বিলের মতো প্লাবনভূমি বর্ষায় ‘স্পঞ্জ’-এর মতো কাজ করে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ করে। এটি দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও স্থানীয় কৃষির লাইফ-লাইন। সেখানে অবৈধ ঘের নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।"
এদিকে ভুক্তভোগী কৃষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সশরীরে বিল অববাহিকা পরিদর্শন করেন। তবে পরিদর্শন শেষে ‘বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩’-এর ২০, ২৮ ও ২৯ ধারা অনুযায়ী পানি নিষ্কাশন পথ অবমুক্ত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জানান, "আমরা আইনগত বিষয়টি খতিয়ে দেখব। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলব। আমরা কাকে দিয়ে কাজ করব সেটা আমরা ভালো বুঝব।"
স্থানীয় সচেতন মহল ও আইনবিদদের মতে, প্রশাসনের এ ধরনের মনোভাব ও দায়িত্ব ঠেলারা নীতি মূলত কোটি কোটি টাকার অবৈধ ঘের রক্ষা এবং কৃষকদের সমস্যা জিইয়ে রাখার এক ‘আমলাতান্ত্রিক পিং-পং খেলা’।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব