সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৪ পিএম  আপডেট: ০৬.০১.২০২৬ ১১:২৮ পিএম  (ভিজিট : ১০০৫)
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় জাতীয় নির্বাচন একটি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনুষঙ্গ। তাই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি প্রক্রিয়া নয় বরং এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নাগরিকের আস্থা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই প্রেক্ষাপটে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ সর্বাগ্রে জরুরি বলে আমি মনে করি। 

গত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে,নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ে, গুজব ছড়ায়, সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ এবং ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একক কোনো বাহিনীর সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, পরিকল্পিত ও পেশাদার উদ্যোগ।

নির্বাচনে নিরাপত্তা মানে কেবল সহিংসতা দমন নয়। নিরাপত্তা মানে ভোটার যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে কেন্দ্রে যেতে পারেন। নিজের ভোট নিজে দিতে পারেন এবং ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কোনো প্রকার চাপ বা প্রভাবের শিকার না হন। প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মীরাও যেন নির্বিঘ্নে প্রচার চালাতে পারেন। গণমাধ্যম যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। এই সামগ্রিক পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়ন করে নিরাপত্তা বাহিনী।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশে নির্বাচনকালীন সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। তাই আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন, গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক ব্যবহার এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি মনে করি, সমন্বিত উদ্যোগে  বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাব, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং সর্বোপরি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, তথ্য আদান-প্রদান ও একক কমান্ড কাঠামোর অধীনে কাজ করা জরুরী। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব বাহিনীকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রতিযোগী হিসেবে নয়।

অতীতে দেখা গেছে, সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে কখনো কখনো একই এলাকায় একাধিক বাহিনী থাকলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও দায়িত্বের অস্পষ্টতায় নানা রকম জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে এই ধরনের  ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে তার মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।

এ কথা বলার উপেক্ষা রাখে না যে,নির্বাচনী নিরাপত্তার মূল ভিত্তি বাংলাদেশ পুলিশ। থানাভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, গুজব ও উসকানি দমনসবকিছুতেই পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

যদিও পুলিশের ভাবমূর্তি এখন সংকটের মুখে। তবে পুলিশের এই দায়িত্ব পালনের জন্য রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফেরানোও একটি বড় বিষয়। ভোটার যদি মনে করেন পুলিশ কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছে, তবে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই আচরণবিধি কঠোরভাবে মানার পাশাপাশি নিরপেক্ষ উপস্থিতি এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি 

র‍্যাবের দ্রুত পদক্ষেপ ও বিশেষ অভিযানের সক্ষমতা নির্বাচনী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে সহিংসতার আশঙ্কা, সন্ত্রাসী তৎপরতা বা সংগঠিত অপরাধ দমনে র‍্যাব কার্যকর। তবে এখানেও স্বচ্ছতা ও আইনানুগ আচরণ অপরিহার্য।র‍্যাবকে যে কোনো অভিযানে মানবাধিকার ও আইনের শাসন বজায় রাখতে হবে। 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী নিরাপত্তায় আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। সুতরাং ত্রয়োদশ নির্বাচনেও প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। পুলিশের ভাবমূর্তির সংকটের প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীই আগামী নির্বাচনের মূল ভরসা বলে আমি মনে করি। 

সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ সফল করতে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনকে শুধু নির্দেশনা দিলেই চলবে না। বরং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন তদারকি, আন্তঃবাহিনী সমন্বয় সভা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা যত বেশি হবে, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও তত বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। কমিশনের প্রতি যদি রাজনৈতিক আস্থা দুর্বল হয়, তবে মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এদিকে আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অপরিহার্য একটি বিষয়। সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং, হটলাইন ও ডিজিটাল কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা যায়। গুজব ও ভুয়া খবর মোকাবিলায় সাইবার মনিটরিংও জরুরি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান কেমন শক্তিশালী হয় তেমনি বিনিয়োগ ও সহযোগিতার সুযোগও বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, সহিংসতা বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদার ও সমন্বিত ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় সক্ষম ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শেষ কথা: আমি মনে করি,আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। যেকোনো মূল্যে এই নির্বাচনকে সফল করতেই হবে। আর এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। পুলিশ, র‍্যাব, আনসার, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনীর সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্বে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও আইনানুগ ভূমিকা পালন করতে হবে। 

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের শক্ত নেতৃত্ব ও নিরপেক্ষ তদারকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সবাইকে  মনে রাখতে হবে যে ,নির্বাচন কারও একক জয় বা পরাজয়ের বিষয় নয় বরং এটি রাষ্ট্র ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়া। সুতরাং আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত, দায়িত্বশীল এবং দূরদর্শী নিরাপত্তা উদ্যোগ।

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft