রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
বাঁশখালীতে বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা আশা খাতুন
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৪০ পিএম   (ভিজিট : ০)
‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’—কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব নারী আশা খাতুন। গত জুলাই মাসের ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে দ্রুত পানি ঢুকে তলিয়ে যায় তাঁর পরিবারের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়স্থল মাটির ঘরটি। এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে প্রতিবেশী এক ব্যক্তির পাকা দালানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। সঙ্গে নিতে পারেননি কোনো কাপড়চোপড়, চাল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

প্রতিবেদককে দেখে বন্যার পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে থাকা আশা খাতুন আঙুল তুলে দেখান, যেখানে একসময় তাঁর সাজানো সংসার ও ঘর ছিল, সেখানে এখন শুধু থইথই ঘোলা পানি। ভেসে গেছে ধানের গোলা, চাল ও হাঁস-মুরগি। এমনকি পুকুরের মাছও তলিয়ে গেছে বানের জলে।

কয়েক দিন টানা বর্ষণের পর গত ১২ জুলাই দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে নিজের ভিটায় এসেছিলেন তিনি, যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে! কিন্তু পানির কারণে কিছুই আর খুঁজে পাননি। নিজের দুর্ভাগ্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, স্বামী আবদুর রাজ্জাক মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে দিনমজুর দুই ছেলের আয়ে কোনোমতে চলত তাঁদের সংসার। সারা জীবনের কষ্টের সঞ্চয়ে তৈরি মাটির ঘরটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় সম্বল। কিন্তু সেই ঘর আজ বিলীন। নিজের ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এই এক কঅর (কাপড়) লৈ বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি।’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সেখানকার প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মাঠ, পুকুর ও গাছপালা একাকার। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও আবার ঘরের টিনের চালা কেবল পানির ওপরে ভেসে আছে। ভাঙা ঘরের সামনে কেউ নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ আবার কাদা সরাচ্ছেন। অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাহাড়ি ঢলের পানি এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি কেউ। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। যার বড় আঘাত এসে পড়ে বাঁশখালীর ওপর। বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ এলাকাই পানিতে তলিয়ে যায়।

সামনে কীভাবে সংসার চালাবেন, কোথায় থাকবেন বা কীভাবে নতুন করে ঘর তুলবেন—এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই আশা খাতুনের কাছে। বৃষ্টির বিরতি আর পুনরায় পানি বাড়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি বিমর্ষ কণ্ঠে বলেন, ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব।’

আশা খাতুনের এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কেবল ঘরবাড়ি ডোবা বা সম্পদ হারানোর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সাথে চিরতরে হারিয়ে যায় নিরাপদে বেঁচে থাকার ঠিকানা ও আগামী দিনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা। পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারের পথ কতটা দীর্ঘ ও কঠিন হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে জরুরি মানবিক সহায়তা এবং সুপরিকল্পিত পুনর্বাসনের ওপর।

আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব






আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft