রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
আইনের তোয়াক্কা না করে কাশিয়ানীতে কৃষকের বুক চিরে বালু উত্তোলন
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ১৫)
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলাজুড়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফসলি জমিতে বোরিং ড্রেজার দিয়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। আদালত অবমাননা করে কৃষকের বুক চিরে নির্বিচারে বালু লুট করা হলেও রহস্যজনক কারণে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার রাজপাট ইউনিয়নের শিলটা-তুতুলিয়া বিল, রাজপাট কলেজের পূর্বপাশের বিল, বরোইহাট ও শুক্তগ্রাম এলাকায় দিনে-রাতে সমানতালে চলছে এই পরিবেশ ধ্বংসের যজ্ঞ। স্থানীয় ড্রেজার মালিক সুন্দর শাহানুর, কালা শাহানুর, শফিকুল, সুজন, সাগর, সোহেল এবং তাদের মদদদাতা অসীম মোল্লা ও নাইমের বিরুদ্ধে ফসলি জমি ধ্বংসের এই সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষার পানিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পানির নিচে বোরিং পাইপ বসিয়ে শত শত ফুট দূর থেকে বালু টেনে আনা হচ্ছে। পানি থাকা অবস্থায় ক্ষত স্পষ্ট না হলেও পানি নেমে গেলে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ চিত্র—৩ থেকে ৫ ফুট গভীর গর্ত, ফাটল ও ব্যাপক ধস। একটি জমিতে ড্রেজার বসানো হলেও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আশপাশের ৮ থেকে ১০টি উর্বর ফসলি জমি। বিশেষ করে এলাকাটি আংশিক সনাতনী অধ্যুষিত হওয়ায় ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু কৃষক। প্রতিবাদ করলেই তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও দেশছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

নাটগ্রামের এক ভুক্তভোগী কৃষক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা বাপ-தாரার আমল থেকে এই জমি চাষ করি। ৩ বিঘা জমির পাশে ড্রেজার বসানোয় জমি ৩ ফুট দেবে গেছে, সেখানে আর ধান হবে না। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেয়—মামলা দিয়ে জেলে ঢুকাবো। আমরা সংখ্যালঘু বলে কি আমাদের জমি কেড়ে নেওয়া এত সহজ?” আরেক প্রবীণ কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই জমি আমাদের মা। এই মায়ের বুক চিরে বালু তুলছে। উর্বর জমি এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে। এটা স্পষ্টতই কৃষি জমি হত্যা।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বালু উত্তোলন দেশের প্রচলিত আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

১. বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩-এর ধারা ৭ক লঙ্ঘন: এই ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার মালিকানাধীন উর্বর কৃষি জমি থেকেও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করতে পারবে না, যদি তাতে পার্শ্ববর্তী জমির ক্ষতি বা ধসের আশঙ্কা থাকে। কাশিয়ানীতে প্রতিটি শর্তই ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
২. একই আইনের ধারা ১৫ লঙ্ঘন: এই আইন অমান্য করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড এবং ড্রেজার মেশিন, পাইপ ও মালামাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
৩. আদালত অবমাননা: ২০২৫ সালে মহামান্য হাইকোর্ট দেশব্যাপী অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হাইকোর্টের সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু তোলা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শুধু রাজপাট ইউনিয়নই নয়, পারুলিয়া, গোয়ালগ্রাম, নাটগ্রাম, হাতিয়াড়া, সিংগা, নিজামকান্দি, মাহমুদপুর, পুইশুর ও শুক্তগ্রামসহ উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের বিভিন্ন বিলে অবাধে চলছে ড্রেজারের তাণ্ডব। খাগড়াবাইড়, চন্দ্রদিপ বিল, বেথুড়ী বিল, সিতারামপুর পশ্চিম ডাঙ্গার বিলসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি থেকে হেসাল মোল্লা, জামাল মোল্লা, টুটুল সিকদার, সাফায়েত, ওমর মোল্লা, আসলাম, অনুপ রায়, সুজিত, লালু, গৌতম, সজল, শরজিত, সিরাজ, সাহিদুল ও নিক্সনসহ অনেকে এই অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন।

এ বিষয়ে কাশিয়ানী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পাপিয়া সুলতানা লিজা জানান, “কৃষি জমি থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। এটা পুরোপুরি বেআইনি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

তবে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানের দাবি সত্ত্বেও বাস্তবে এর কোনো সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অবিলম্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সকল অবৈধ ড্রেজার জব্দ, জড়িত সিন্ডিকেটকে বালুমহাল আইনের কঠোর ধারায় আইনের আওতায় আনা এবং কৃষকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার অসহায় কৃষকরা।

আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব






আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft