একদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া আর বাজারে প্লাস্টিক পণ্যের অবাধ দখল, অন্যদিকে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম—সব মিলিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন বাঁশ-বেত শিল্পের কারিগররা। জীবিকার অন্য কোনো পথ জানা না থাকায় শত ভোগান্তি ও লোকসানের মুখেও ঐতিহ্যবাহী এ বাঁশের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকার আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রামের কারিগরপাড়া ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরের দাওয়ায় বা গাছের ছায়ায় বসে খাড়ি, টুকরি, ডুলি, টোনা, ধামা ও মোড়াসহ নানা গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হস্তশিল্পীরা। তবে বাহ্যিক এই ব্যস্ততার আড়ালে জমা হয়ে আছে এক নীরব হাহাকার।
কারিগররা জানান, বর্তমানে একটি ভালো মানের বাঁশ কিনতে গুণতে হচ্ছে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে প্লাস্টিকের বেত ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচ যোগ করলে উৎপাদন খরচ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় বিক্রয়মূল্যের কাছাকাছি। দিনভর কঠোর পরিশ্রম শেষে পণ্য বিক্রি করে যা থাকে, তা দিয়ে বর্তমান নিত্যপণ্যের চড়া বাজারে পরিবার-পরিজন নিয়ে দু'বেলা দু'মুঠো অন্নসংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু কাঁচামালের দামই নয়, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মাটি কাটায় ড্রেজার ও এস্কেভেটরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী টুকরির চাহিদা অনেক কমে গেছে। ফলে বাপ-দাদার শতবছরের পুরোনো এই পেশা আঁকড়ে ধরে রাখা পরিবারগুলোর সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। অনেকেই ভিটেমাটি আর স্মৃতিকে পেছনে ফেলে উপার্জনের তাগিদে দিনমজুরি, রিকশা চালানো বা বিদেশে পাড়ি জমানোর মতো পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রবীণ কারিগরদের আক্ষেপ, একসময় বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে কৃষিকাজ—সবখানেই বাঁশের তৈরি পণ্যের কদর ছিল। এখন মেলা বা সৌখিন কেনাকাটা ছাড়া এসবের চাহিদা খুব একটা দেখা যায় না। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এ শিল্পের টিকে থাকা অসম্ভব।
শিল্পসচেতন মহলের মতে, গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম অংশ এই কুটিরশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণপ্রদান, বাঁশ চাষে উৎসাহ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যবাজারজাতকরণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব