কার্তিক মাসের শুরুতেই নীলফামারীর ডিমলার মাঠে মাঠে পাকতে শুরু করেছে সোনালি আমন ধান। আগাম জাতের ধান পেকে ওঠায় কোথাও চলছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের প্রস্তুতি, আবার কোথাও কৃষকের ঘরে উঠছে নতুন ধান। নতুন ধানের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে কৃষকের বাড়ি। পাশাপাশি শুরু হয়েছে নতুন চালের পিঠা-পুলি তৈরির আয়োজন। তবে যেসব কৃষকের ধান এখনও পাকেনি, তাদের কেউ কেউ আগাম ধান কাটা কৃষকদের কাছ থেকে ধান ধার নিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।
কৃষকরা জানান, আগে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকে আমন ধান কাটা শুরু হতো। কিন্তু আগাম জাতের ধান চাষ ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার প্রায় এক মাস আগেই ধান ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমন ধানের ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্রি ধান-৩৩, ৯৪, ৫৬, ৭৫, বিনা-৭, ভারতীয় জাতের গুটি স্বর্ণা, স্বর্ণা-৫ ও মানুন স্বর্ণা, পানপাতাসহ বিভিন্ন জাতের ধান পাকতে শুরু করেছে। একসময় আমন চাষে প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ ধান পাওয়া গেলেও বর্তমানে উন্নত জাতের ধান চাষ করে অনেক কৃষক ১৮ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ফলন পাচ্ছেন।
এদিকে ধান কাটার মৌসুমে গো-খাদ্যের সংকটের কারণে কাঁচা খড়ের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ধান কাটার পর খড়ের আঁটি বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা। প্রতি বিঘা জমির ধান কাটার পর পাওয়া কাঁচা খড়ের আঁটি বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে ধানের দাম কিছুটা কম হলেও খড় বিক্রির মাধ্যমে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সুন্দরখাতা গ্রামের কৃষক রেজাউল করিম জানান, এবার তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে তার সব জমির ধান পেকে গেছে। ধানের অবস্থাও বেশ ভালো। প্রতি বিঘায় ১৮ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়ার আশা করছেন তিনি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
তিনি আরও জানান, বর্ষার শেষ দিকে ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল। এ কারণে জমিতে কয়েক দফা কীটনাশক স্প্রে করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
ধানের দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কৃষক রেজাউল করিম বলেন, ডিমলার বাবুরহাট বাজারে নতুন ধান প্রতি মণ প্রায় এক হাজার থেকে ১১ শত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ ধানের দাম দেড় হাজার টাকা হলে কৃষকরা ভালোভাবে লাভবান হতে পারতেন। পাঁচ বিঘা জমির ধান কাটার পর তিনি জমিগুলোতে আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করবেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত শাকসবজি বাবুরহাট বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
আগাম আমন ধান কাটার পর জমি ফাঁকা করে দ্রুত চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেক কৃষক। এসব জমিতে আলু, সরিষা, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন শীতকালীন ফসল ও শাকসবজি আবাদ করবেন তারা। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, চলতি আমন মৌসুমে উপজেলায় ২১ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পুরো জমিতেই আমন ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন। তবে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান উৎপাদিত হতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, নতুন ধান বাজারে আসতে শুরু করায় বর্তমানে দাম কিছুটা কম। তবে পুরোপুরি মৌসুম শুরু হলে এবং চালকল মালিকরা ধান কেনা শুরু করলে বাজারে ধানের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি আগাম আমন ধান কাটার পর জমিতে আলু, গম, সরিষা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শীতকালীন ফসল ও শাকসবজি আবাদ করে কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারবে।
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন