প্রশাসনিক দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে হাতে মার্কার পেন নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অংশ নিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরলেন বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয়, করলেন একের পর এক প্রশ্ন। উত্তর শুনে ভুলগুলো শুধরে দিলেন এবং সহজ বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন অধ্যায়।
এমন ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ক উদ্যোগ নিয়েছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।
প্রশাসনিক প্রধানের কাছ থেকে চমৎকার পাঠদানের সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন ব্যাপক আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তেমনি শিক্ষার প্রতি তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তুলতে প্রশাসনের এমন সরাসরি অংশগ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে প্রায় ৪০ মিনিট পাঠদান করেন ইউএনও রূপম দাস। পাঠদানকালে তিনি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা এবং শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে পাঁচজনকে সেরা হিসেবে বাছাই করেন এবং পুরস্কৃত করার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ওই পাঁচ শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের হাতে বিশেষ শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন তিনি।
পাঠদানের সময় একটানা বক্তৃতা না দিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন ইউএনও। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো সহজ ভাষা, বাস্তব জীবনের উদাহরণ ও বিভিন্ন উপমার সাহায্যে বুঝিয়ে বলেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন উপস্থাপন করেন, তাঁদের উত্তর শোনেন এবং বিষয়গুলো যুক্তি দিয়ে শেখার পরামর্শ দেন। ফলে শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয় প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ।
ব্যতিক্রমী এই অভিজ্ঞতা নিয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বলে, "ইউএনও স্যার খুব সহজভাবে আমাদের বিজ্ঞানের বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিয়েছেন। স্যারের কাছ থেকে পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার যে দিকনির্দেশনা পেয়েছি, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। স্যার প্রশ্ন করেছেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি, না বুঝলে আবার বুঝিয়ে দিয়েছেন।"
পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফছর উদ্দিন আহম্মদ বলেন, "ইউএনও স্যারের পাঠদান পদ্ধতি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিভিন্ন উপমা ও উদাহরণের সাহায্যে তাঁর এই পাঠদান শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখবে।"
অভিভাবক মোস্তাফিজ বলেন, "একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন নিজে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পড়ান এবং ভালো পারফর্ম করা শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করেন, তখন শিশুরা দারুণ উৎসাহ পায়। এতে তাদের পড়াশোনার প্রতি ভীতি দূর হবে এবং ভালো মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা জাগবে।"
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, "পড়ানো আমার ভীষণ পছন্দের একটি কাজ। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত হয়তো সম্ভব হয় না, তবে সুযোগ পেলেই বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাই। খেয়াল করেছি, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের বুনিয়াদি জ্ঞানে কিছু ঘাটতি রয়েছে। তারা যাতে মুখস্থ নির্ভর না হয়ে বুঝে শেখে, সে কারণেই সহজভাবে বিষয়গুলো বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কথা দিয়েছিলাম সেরা পাঁচজনকে পুরস্কৃত করব, আজ তাদের কার্যালয়ে ডেকে শিক্ষা উপকরণ উপহার দিয়েছি।"
আজ বুধবার উপহার প্রদানকালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান উপস্থিত ছিলেন।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব