বিদেশি ফল রামবুটান। একসময় দেশের মানুষের কাছে অপরিচিত এই ফল এখন চাষ হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নন্দীপাড়া গ্রামে রামবুটান চাষ করে সেই সম্ভাবনাই দেখিয়েছেন চাচা-ভাতিজা শেখ আশরাফুল ইসলাম ও শেখ মামুন।
ছয় বছর আগে ২০ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে গড়ে তোলা তাদের ‘তাইফ এগ্রো’ বাগানে এখন রামবুটান গাছে ফল ধরছে। বছরে এ ফল বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন রামবুটানের নার্সারি; প্রতিটি চারা বিক্রি করছেন প্রায় ২ হাজার টাকা দরে।
সরেজমিনে নন্দীপাড়া গ্রামের বাগানটিতে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি রামবুটান গাছ। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, বাগানে মোট ২১২টি রামবুটান গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১০টি গাছ ফল দিচ্ছে। কোনো কোনো গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লালচে রামবুটান। ফলন ও বাগানের সম্ভাবনা দেখতে স্থানীয় কৃষকরাও সেখানে ভিড় করছেন।
তবে এ সাফল্যের শুরুটা এতটা সহজ ছিল না। বাগান তৈরির সময় প্রায় ৪০০টি রামবুটানের চারা রোপণ করেছিলেন আশরাফুল ও মামুন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে বেশ কিছু চারা মারা যায়। এতে হতাশ হয়ে পড়েন তারা। কিন্তু গাছগুলোতে ফল আসার পর বদলে যায় পরিস্থিতি। ফল বিক্রি করে বাগান তৈরিতে প্রাথমিকভাবে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তা উঠে আসে। এরপর নতুন করে উৎসাহ নিয়ে বাগানের পরিচর্যায় মনোযোগ দেন তারা।
বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা মালয়েশিয়া-ফেরত কৃষক সোহেল রানা বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে ২০ বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে বাগানটি শুরু করেন শেখ আশরাফুল ইসলাম ও শেখ মামুন। প্রথমদিকে চারা মারা যাওয়ায় তারা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বছর ঘুরতেই রামবুটান গাছে ফল ধরতে শুরু করে। ফল বিক্রি করে ব্যয় উঠে আসায় উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
সোহেল রানা বলেন, রামবুটান পাইকারিতে প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। কয়েকজন বিক্রেতা বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করছেন। ফলে স্থানীয় বাজারের বাইরেও এ ফলের ক্রেতা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, রামবুটান চাষের জন্য বেলে-দোআঁশ মাটি উপযোগী। গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে প্রায় ২০ ফুট দূরত্ব রাখা ভালো। নিয়মিত পানি, গোবর ও জৈব সারসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হয়। পরিচর্যায় যত্নবান হলে কয়েক বছরের মধ্যে বাগান থেকে লাভ পাওয়া সম্ভব।
তার ভাষ্য, পূর্ণবয়স্ক একটি রামবুটান গাছ থেকে বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাগানের কিছু গাছ বছরে দুইবারও ফল দেয়। ফলের খোসা শক্ত হওয়ায় সাধারণ পাখির আক্রমণ তুলনামূলক কম। তবে কাঠবিড়ালির উপদ্রব রয়েছে। রামবুটান উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য চারা উৎপাদনেও গুরুত্ব দিচ্ছেন আশরাফুল ও মামুন। বাগানের একাংশে তৈরি করেছেন রামবুটানের নার্সারি। সেখান থেকে প্রতিটি চারা প্রায় ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব চারা পাঠানো হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। বাগানে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে পাশেই গরুর খামার করেছেন তারা। খামার থেকে পাওয়া গোবর রামবুটান গাছের গোড়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, এতে বাগানে জৈব সারের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হচ্ছে। চাষি শেখ আশরাফুল ইসলাম ও শেখ মামুন বলেন, শুরুতে অনেক চারা মারা যাওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু গাছে ফল আসার পর আমাদের সেই হতাশা কেটে যায়। প্রথম ফল বিক্রি করেই বাগান তৈরিতে করা খরচের টাকা উঠে আসে। এরপর আমরা আরও গুরুত্ব দিয়ে পরিচর্যা শুরু করি। বর্তমানে বছরে প্রায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার রামবুটান বিক্রি করছি।
তারা বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে রামবুটান ভালো ফলন দিতে পারে-আমাদের বাগান তার একটি উদাহরণ। দেশের কৃষকেরা যদি নতুন নতুন ফলের চাষে এগিয়ে আসেন এবং কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা পান, তাহলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। রামবুটান একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য উপকারী। ফলটির স্বাদ, আকর্ষণীয় গঠন ও পুষ্টিগুণের কারণে দেশে ধীরে ধীরে এর চাহিদাও বাড়ছে।
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, রামবুটান এ অঞ্চলে তুলনামূলক নতুন একটি ফল। উপযুক্ত মাটি, আবহাওয়া ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে চাষের আগে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সঠিক জাত নির্বাচন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নতুন ফলের চাষে কৃষকদের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনাময় ফলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
তিনি আরো জানান এই ফলের রোগ বালাই খুবই কম।
স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা জানান, আগে রামবুটান সম্পর্কে তাদের তেমন ধারণা ছিল না। এখন বাগানে ফল ধরতে দেখে অনেকের মধ্যে এ ফলের চাষ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফলটির উচ্চমূল্য ও চাহিদা দেখে কেউ কেউ নিজেদের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রামবুটান চাষের কথাও ভাবছেন।
তবে চাষের খরচ, ফলন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। ফল বিক্রেতারা জানান, রামবুটানের স্বাদ ও আকর্ষণীয় চেহারার কারণে ক্রেতাদের মধ্যে এ ফলের আগ্রহ রয়েছে। বাজারে অন্যান্য প্রচলিত ফলের তুলনায় রামবুটানের দাম বেশি হলেও অনেকে নতুন ও বিদেশি ফল হিসেবে এটি কিনছেন।
বর্তমানে অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রামবুটান বিক্রি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ক্রেতা তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বাজারে এ ফলের সরবরাহও বাড়তে পারে। নন্দীপাড়ার এই বাগানকে ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ফল হিসেবে রামবুটান চাষের সম্ভাবনা নিয়ে অনেকেই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া বড় পরিসরে নতুন ফলের বাগান না করে প্রথমে মাটি, আবহাওয়া, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ ও বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ এখনো তুলনামূলক নতুন। তাই ভালুকার এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু বছরে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়ভাবে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারা তৈরি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের মাধ্যমে নতুন একটি কৃষি উদ্যোগের পথও তৈরি হচ্ছে। সঠিক প্রযুক্তিগত পরামর্শ, মানসম্মত চারা ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রামবুটানের মতো উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
আজকালের খবর/বিএস