মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের ৫ হাজার নাগরিককে ধাপে ধাপে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম চূড়ান্ত করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীলভাবে এবং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় তাদের প্রত্যাবাসন করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। মিয়ানমার সরকারের ১৩ আগস্টের কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে এ ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যাবাসনের তারিখও সংশ্লিষ্ট সমন্বয় সভায় অনুমোদন করা হয়।
প্রথম দফার প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে মিয়ানমার নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও সমন্বয় কার্যক্রম মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে মিয়ানমারের ৪ হাজার ৮ জন নাগরিককে বিশেষভাবে শরণার্থী হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিদের জন্য চালু করা ‘ডকুমেন্ট পেন্ডাফতারান পেলারিয়ান’ (ডিপিপি) বা শরণার্থী নিবন্ধন কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আরও ৫ হাজার ব্যক্তি মিয়ানমারে ধাপে ধাপে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, গত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির ইমিগ্রেশন ডিপোতে আটক ১০ হাজার ৩৮৮ জন মিয়ানমারের নাগরিককে শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ ও রয়্যাল মালয়েশিয়ান পুলিশ এসব ব্যক্তির পরিচয়, নাগরিকত্ব, ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত অবস্থান, শরণার্থী দাবি এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করছে। এ নিবন্ধন কার্যক্রম ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারের কৌশলের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে ধাপে ধাপে, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীলভাবে সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিদের নিবন্ধন ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিপিপির মাধ্যমে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমাধানের একটি সুস্পষ্ট পথ থাকা জরুরি। ফলে দুটি কার্যক্রম একই সঙ্গে পরিচালিত হবে এবং একে অপরকে সম্পূরক করবে।
এরই ধারাবাহিকতায় ইমিগ্রেশন ডিপোর বাইরে অবস্থানরত সব অবৈধ অভিবাসীর জন্য ডিপিপি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কার্ডধারী এবং শরণার্থী হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিরাও থাকবেন। নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারের কাছে তাদের বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, যা ভবিষ্যতে নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো হবে।
ডিপিপির শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ব্যক্তিদের ‘ডিপিপি কার্ড’ দেওয়া হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে তারা নির্ধারিত শর্ত, নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের নজরদারির আওতায় সাময়িকভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থানের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত ও স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে সম্মত ব্যক্তিদের শনাক্ত করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার সরকার বা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়ায় থাকা ৯৫ শতাংশের বেশি শরণার্থী মিয়ানমার থেকে আসা। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা, চিন, কারেন ও মন জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। তাই এ সমস্যার সমাধান একতরফাভাবে করা সম্ভব নয়। এ কারণে মালয়েশিয়া সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা আরও জোরদার করবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসন হবে দুই দেশের সম্মতি ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতিতে। একই সঙ্গে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন, তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও চূড়ান্ত সমাধানের পথকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
আজকালের খবর/বিএস