নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে দাঁতের মাড়ির পাশে বেড়ে ওঠা মাংস কাটার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মোঃ লিয়ন মিয়া (১৪) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেকসে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লিয়ন মিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত দন্ত চিকিৎসক মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণের চেম্বারে ভাংচুর চালান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। নিহত লিয়ন মিয়া মোহনগঞ্জ পৌরশহরের টেংগাপাড়া এলাকার খোকন মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চেম্বার করা মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার পর থেকেই লিয়ন মিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
তবে মোঃ রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, তার চিকিৎসার কারণে নয়, আগে থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় কিশোরটির মৃত্যু হয়েছে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার সকালে লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় তাকে চিকিৎসার জন্য মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থাকা মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণের চেম্বারে তাকে নিয়ে যান এক ব্যক্তি।
পরিবারের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণকে ভালো চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণ মাড়ির বাড়তি মাংস কেটে দেন। এরপরই রক্তক্ষরণ শুরু হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। চিকিৎসা শেষে ওষুধপত্র দিয়ে লিয়ন মিয়াকে বাড়িতে পাঠানো হয়। পরদিন লিয়ন মিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে আবার মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণের কাছে নিয়ে যান।
তখন তিনি নতুন করে ওষুধপত্র লিখে দেন বলে জানান স্বজনেরা। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার পরও লিয়ন মিয়ার অবস্থার উন্নতি হয়নি। সোমবার দুপুরে লিয়ন মিয়াকে আবার মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণ তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দন্ত চিকিৎসক জয়া রানী দেবনাথের কাছে নিয়ে যান। জয়া রানী দেবনাথ লিয়নের অবস্থা গুরুতর দেখে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তাকে রেফার করেন।
এরই মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকা অবস্থায় লিয়ন মিয়া অচেতন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত লিয়ন মিয়ার বাবা খোকন মিয়া বলেন, লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় শনিবার সকালে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। গেটের কাছে এক ব্যক্তি ভুল বুঝিয়ে মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি, ওই ব্যক্তি দালাল। হিরণ মাড়ির অতিরিক্ত মাংস কেটে দেওয়ার পর থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
এরপর কয়েক দফা তার কাছে নিয়ে গেলেও লিয়নের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহে রেফার করেন। কিন্তু তার আগেই লিয়ন অচেতন হয়ে পড়ে এবং পরে মারা যায়। অভিযোগের বিষয়ে মোঃ রফিকুল ইসলাম হিরণ বলেন, ওই ছেলের দাঁতের মাড়ির মাংস পচে ক্যানসার হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু ড্রেসিং করেছি, কোনো অপারেশন করিনি। তেমন বেশি রক্তক্ষরণও হয়নি।
আমার চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়নি। আগে থেকেই তার অবস্থা খারাপ ছিল। প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্ত করা হোক। তিনি আরও বলেন, তার চেম্বারে হামলা চালিয়ে যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনার বিচার চান তিনি। তবে নিজের চিকিৎসা সংক্রান্ত যোগ্যতা ও পদবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তার চেম্বারে এলএমএএফ ও ডিএমএ পদবি লেখা রয়েছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অলক কান্তি তালুকদার বলেন, বিষয়টি ওই সময়ই চিকিৎসকেরা আমাকে জানিয়েছেন। এলএমএএফ কোর্সধারীরা কোনো চিকিৎসক নন। কোনো রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই।
সাধারণ মানুষকে বলব, আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দন্ত চিকিৎসক রয়েছেন। আপনারা কারও প্ররোচনায় না পড়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নিন।
মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
আজকালের খবর/ এমকে