
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সাধারণভাবে সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক জোট অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (অ্যাফিড)। তবে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের আশপাশে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড, দলীয় প্রতীক বিতরণ এবং ভোটার পরিবহনের ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায় অ্যাফিড। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৯৯ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন সুশৃঙ্খল ছিল এবং ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে নিরাপত্তাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জোর খাটানোর উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা পর্যবেক্ষণে আসেনি।
অ্যাফিডের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের দিন সকালে একজন প্রার্থীকে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে দলীয় প্রতীকসংবলিত প্রচারপত্র বিতরণ করতে দেখা গেছে। পরে এসব প্রচারপত্র মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া ৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার স্লিপ দেওয়ার বুথ থেকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোটারদের উৎসাহিত করার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন পর্যবেক্ষকেরা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যবেক্ষণ করা এলাকার ৭২ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন যানবাহনে করে আনা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু পরিবহনের ব্যবস্থা প্রার্থীরা করেছিলেন। এ ধরনের পরিবহন ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে সহায়তা করলেও এর পেছনে কোনো নির্বাচনী শর্ত বা সমর্থন আদায়ের বিষয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এসব কর্মকাণ্ড নির্বাচনী আচরণবিধি ও আরপিওর ৭৯ অনুচ্ছেদের আলোকে পর্যালোচনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
লাইট হাউজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং অ্যাফিডের সদস্য সচিব মো. হারুন অর রশিদ বলেন, সাধারণভাবে সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ ইতিবাচক দিক। তবে নির্বাচনের দিনের প্রচারণার নিয়ম সব প্রার্থীর মেনে চলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে এসব নিয়ম কার্যকর করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো নির্বাচনী আইনের আলোকে খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ভোটকেন্দ্রের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় ভোটকক্ষ যথাযথভাবে সাজানো হয়েছিল। একই সংখ্যক কেন্দ্রে খালি ব্যালট বাক্স প্রদর্শন ও সিলগালা করা হয়। ৯৬ শতাংশ কেন্দ্র সকাল ৮টার মধ্যে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিল। তবে কিছু কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যাফিড। কারণ, কোনো কোনো ক্যামেরায় ভোটারদের ব্যালটে সিল দেওয়ার দৃশ্য দেখা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, যা ভোটের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
প্রতিবন্ধী ও চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে এমন ভোটারদের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ করা ২৪ শতাংশ কেন্দ্রে অন্যের সহায়তা ছাড়া চলাচলে অক্ষম ভোটারদের প্রবেশের উপযুক্ত ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। শুধু নিচতলায় কেন্দ্র স্থাপন করলেই সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় না উল্লেখ করে সিঁড়িমুক্ত পথ তৈরির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকেরা আরও জানান, ৮৩ শতাংশ এলাকায় নিয়মিতভাবে ভোটার তালিকার সঙ্গে ভোটারের পরিচয় বা ছবি মিলিয়ে দেখা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ করা ১২৬টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটিতে প্রক্সি ভোটের সন্দেহের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় সব কেন্দ্রেই পর্যবেক্ষকদের ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়।
নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যবেক্ষণ করা কেন্দ্রগুলোতে নারী পোলিং কর্মকর্তা থাকলেও কোনো কেন্দ্রে নারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ছিলেন না। নির্বাচনী দায়িত্বের নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে অ্যাফিড।
এদিকে, ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রে বয়স্ক ভোটার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ৯৩ শতাংশ কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের সঙ্গে সমান আচরণের তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগের নির্বাচনের তুলনায় উপস্থিতি কমেছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ উপনির্বাচনের সরকারি হিসাবের তুলনায় এ হার বেশি। অ্যাফিড জানিয়েছে, শুধু ভোটার উপস্থিতির হার দিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বা ভোটারদের আস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ভোট গণনা সম্পর্কেও ইতিবাচক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রে বৈধ ও অবৈধ ব্যালট একইভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ৯৬ শতাংশ কেন্দ্রে ফলাফল প্রকাশ বা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভোট গণনার সময় এজেন্টদের কাছ থেকে দুটি অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেলেও কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানির ঘটনা পর্যবেক্ষণে আসেনি।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ মতবিনিময়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে অ্যাফিড। এ ধরনের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা এবং নির্বাচনী অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্রেসি ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন তালেয়া রহমান।
অ্যাফিডের সুপারিশে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিন প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আরপিওর ৭৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তদন্ত করতে হবে। অভিযোগকারীদের নির্দিষ্ট স্থান, সময়, কর্মকাণ্ড ও প্রমাণসহ অভিযোগ জমা দিতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, অ্যাফিড ৩০টি নাগরিক সমাজ সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৫২ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে। ১২৬টি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন এবং নির্বাচনের আগের পরিবেশ নিয়ে তিনজন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক বিবৃতিটি তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব