বগুড়ায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মচারী সংকট চলছে। এর ফলে রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বগুড়ার স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলার সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শয্যা থেকে শুরু করে মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। তীব্র জনবল ঘাটতির কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যেই কর্মস্থল থেকে বিনা অনুমতিতে পালিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালের এই অব্যবস্থাপনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ব্যক্তি পরিচালিত ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বাড়ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, বর্ধিত শয্যায় সেবা কার্যক্রম চালুর অনুমতি মিললেও আগের জনবল সংকট কাটেনি। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীর চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপজেলাভিত্তিক হালনাগাদ চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে মঞ্জুরীকৃত দুই হাজার সাতশ সাতাশি জনের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন এক হাজার আটশ বিশ জন। চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পদে মোট ৯৬৭টি জনবল শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে মঞ্জুরীকৃত চারশ তিরাশি চিকিৎসকের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র দুইশ বিয়াল্লিশ জন, বাকি দুইশ একচল্লিশটি পদই শূন্য। প্রথম শ্রেণির অন্যান্য পাঁচটি পদের মধ্যে একজন কর্মরত থাকলেও চারটি পদ শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির নার্সিং সেবা ও মিডওয়াইফারি সংশ্লিষ্ট চারশ তেতাল্লিশ পদের মধ্যে এগারোটি শূন্য এবং চারশ বত্রিশ জন কর্মরত আছেন। তৃতীয় শ্রেণির মঞ্জুরীকৃত এক হাজার পাঁচশ ষোল পদের মধ্যে এক হাজার বাষট্টি জন কর্মরত থাকলেও চারশ চৌচল্লিশটি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির তিনশ চল্লিশ পদের মধ্যে মাত্র তিরাশি জন কর্মরত আছেন এবং দুইশ ছাপ্পান্নটি পদ শূন্য রয়েছে। এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
এদিকে সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দৌরাত্ম্য রুখতে প্রতিটি ক্লিনিকে মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার ও ডেলিভারি রুমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি না থাকা, হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকা, নিয়মিত ডিউটি চিকিৎসক না থাকা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশসহ নানা অপরাধে বিভিন্ন ক্লিনিকে জরিমানা করা হচ্ছে।
বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র আরও শোচনীয়। আদমদীঘি, সান্তাহার, দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ, আলিয়ারহাট, গাবতলী, সোনাতলা, সারিয়াকান্দি, ধুনট, শেরপুর, শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অনুমোদিত পদের বিপরীতে অর্ধেকের বেশি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। এর ওপর অনেকের ডেপুটেশনে অন্য স্থানে দায়িত্ব পালন করার কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল মাহমুদ লিটন জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে বিপুল সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে রোগীরা মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করছেন। এর মধ্যেই জনবল সংকটের মুখে কয়েকজন চিকিৎসক বদলি হয়েছেন, অনেকে ছুটিতে বা অনুপস্থিত রয়েছেন। বিশেষ করে মেডিকেল অফিসার ডা. কাশমেরী আফরিন কোনো ছুটি না নিয়ে এবং যোগাযোগ ছাড়াই পালিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। এছাড়া ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিশেষজ্ঞরাও ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত আছেন।
বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম জানান, সীমিত চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। শয্যা উন্নীতকরণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লোকবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি পাওয়া গেলে চিকিৎসাসেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব