চলতি বছরের গত ২১ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে দেশের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শীর্ষ পদে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের এক বছরের মেয়াদ। এই এক বছরে অন্তর্বতীকালীন সরকারের ভঙ্গুর দশা থেকে স্টালিনের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় সংস্কৃতি চর্চার এই আতুর ঘর। মেয়াদ শেষ হওয়ায় পদটি শূন্য হলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহা. হারুন-অর-রশীদকে একাডেমির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সাংস্কৃতিক মহলে এখন বড় আলোচনার বিষয়— কে বসছেন শিল্পকলার ম্যাজিক্যাল চেয়ারে (ডিজি) যার হাত ধরে পুরে দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশীয় সংস্কৃতির বিকাল লাভ করবে?
এ নিয়ে এখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনা। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরকার কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে এক বছরের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেয়।
শিল্পকলা একাডেমির অলিন্দ থেকে শুরু করে মগবাজারের মিডিয়া গলি ও সেগুনবাগিচার নাট্যপাড়া— সবখানেই এখন একই চর্চা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদায়ি মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন আবারও এই পদে নিয়োগের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। আজকালের মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নতুন প্রজ্ঞাপন আসতে পারে।
সূত্র জানায়, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে একাধিক ব্যক্তির নাম শোনা যাচ্ছে। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একমাত্র বিদায়ি মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের ফাইল জমা পড়েছে।
পুনর্নিয়োগের ব্যাপারে আশাবাদী রেজাউদ্দিন স্টালিনও। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও লালনভূমির প্রধান কেন্দ্র। গত এক বছর অত্যন্ত প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য দিয়ে আমি এই গুরুদায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। বিগত দিনে দেশের সামগ্রিক পট পরিবর্তনের পর একাডেমির প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য। একটি বছর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়। এই অল্প সময়ে সংস্কৃতির বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর যে রূপরেখা আমরা তৈরি করেছিলাম, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়; আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। আমি সব সময়ই সাধারণ শিল্পী ও মুক্তমনা সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে থেকে কাজ করতে চেয়েছি। সরকার যদি আমার গত এক বছরের কাজের মূল্যায়ন করে আবারও এ দায়িত্বে আমার ওপর আস্থা রাখে, তাহলে আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, অসম্পূর্ণ কাজগুলো সফলভাবে করতে পারব।
স্টালিন বলেন, শিল্পকলা একাডেমিকে যেকোনো জটিলতামুক্ত করে প্রকৃত অর্থেই শিল্পীবান্ধব ও জনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে শিল্পকলাকে নতুন রূপ দিতে চাই।
একাডেমি-সংশ্লিষ্ট একাংশের অভিমত, গত এক বছরে শিল্পকলা একাডেমির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং স্থবির হয়ে পড়া সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে গতি আনতে রেজাউদ্দিন স্টালিন ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। তার দায়িত্বকালে একাডেমি সাধারণ শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরিতে মনোযোগী ছিল। ফলে সাধারণ শিল্পী ও কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই চাইছেন তার মেয়াদের নবায়ন বা পুনর্নিয়োগ হোক।
জনপ্রশাসন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়মিত মহাপরিচালক নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহা. হারুন-অর-রশীদ তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে শিল্পকলার দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান থেকে শুরু করে রুটিন কাজগুলো সচল রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। এর ধারাবাহিকতায় শিল্পকলা একাডেমির দীর্ঘকালীন মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী পদত্যাগ করেন। পরে নাট্যনির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদসহ একাধিক অন্তর্বর্তী রদবদলের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পান আশির দশকের বিশিষ্ট কবি ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত রেজাউদ্দিন স্টালিন।
শিল্পকলা একাডেমি কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের হাজারো শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। বিগত দিনে স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা মনে করছেন, একটি আধুনিক ও স্মার্ট শিল্পকলা একাডেমি গড়ে তোলার যে স্বপ্ন এখন দেশের সাধারণ শিল্পীরা দেখছেন, তা বাস্তবায়নে রেজাউদ্দিন স্টালিনের মতো একজন কবি ও প্রাজ্ঞ সংগঠক প্রয়োজন।
আজকালের খবর/আতে