
গত কয়েক দশক ধরে চীনা চলচ্চিত্র শিল্প অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক আয়কারী কিছু চলচ্চিত্র দেশটি নির্মাণ করেছে। এই চলচ্চিত্রগুলি কেবল বক্স অফিসের রেকর্ডই ভাঙে না বরং তাদের আকর্ষণীয় গল্প এবং অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের মন জয় করেছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, লগ্নি সুরক্ষা, বিপণন ব্যবস্থা, পর্যটনকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী করে তুলে ধরছে। ফলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে বর্হিঃবিশ্ব থেকেও লগ্নি হচ্ছে কাড়ি কাড়ি অর্থ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা এবং অনলাইন গেমিং জগতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি টেনসেন্ট—হলিউডে ছোট স্টুডিওতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ‘মিশন: ইম্পসিবল’-এর সর্বশেষ কিস্তি এবং গ্রীষ্মকালীন ব্লকবাস্টার ‘স্টার ট্রেক বিয়ন্ড’ ও ‘টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস: আউট অফ দ্য শ্যাডোস’-এর মতো চলচ্চিত্রে অর্থায়ন করেছে। আলিবাবা ঘোষণা দেয় যে, তারা বিশ্বজুড়ে এবং চীনে চলচ্চিত্র প্রযোজনা, বিতরণ ও অর্থায়নের লক্ষ্যে হলিউডের সর্বোচ্চ আয়কারী পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। এমনকি ‘হাঙ্গার গেমস’ সিরিজের নির্মাতা স্টুডিও ‘লায়ন্সগেট’-এ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই হলিউডে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে আসছে। তবে চীনের বিষয়টি ভিন্ন। ‘চায়না মিডিয়া ক্যাপিটাল’ (সিএমসি)-এর প্রধান লি রুইগাং বলেন, “আমাদের যেমন প্রচুর অর্থ আছে, তেমনি আছে বিশাল ক্ষুধা বা সক্ষমতা।” উল্লেখ্য, সিএমসি একটি প্রাইভেট-ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠান যারা ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ড্রিমওয়ার্কস এবং আইম্যাক্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। লি আরও বলেন, “হলিউডে ব্যয় করার মতো অর্থ এবং দেশের ভেতরেই এক বিশাল বাজার—উভয়ই চীনের রয়েছে। চীন ও হলিউডের এই যৌথ উদ্যোগ এগিয়ে যাবে।”
চায়না ফিল্ম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিএফএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির চলচ্চিত্র শিল্প মোট ৮১৭.২৬ বিলিয়ন ইউয়ান (১১৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বা আউটপুট তৈরি করেছে, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চলচ্চিত্র শিল্পে পরিণত করেছে।
উল্লেখযোগ্য যে, নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে সিএফএ দেশজুড়ে “ফিল্ম-প্লাস” বা চলচ্চিত্র-কেন্দ্রিক বহুমুখী উদ্যোগের একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম চালু করেছে।
সিএফএ-এর উপ-প্রধান লুও ইয়াং বলেছেন— “চলচ্চিত্র শিল্প পর্যটন, ভোজন, প্রযুক্তি, গেমিং এবং পণ্য বিপণন খাতের সাথে একীভূতকরণের প্রক্রিয়া জোরদার করতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।”
চিরায়ত চীনা উপাখ্যান ‘জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট’-এর অনুপ্রেরণায় নির্মিত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘নোবডি’ এই রূপান্তরের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
এই চলচ্চিত্রটিকে কেন্দ্র করে ৮০০-এরও বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্য বাজারে আনা হয়েছে, যা খুচরা বিক্রয় থেকে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ইউয়ান আয় করেছে। এছাড়া, এটি ৩০টিরও বেশি কোম্পানির সাথে আইপি লাইসেন্সিং এবং কো—ব্র্যান্ডিং চুক্তিও সম্পন্ন করেছে। একটি কফি চেইন শপের সাথে যৌথ উদ্যোগটি বিশেষ সাফল্য পেয়েছে; সেখানে এই চলচ্চিত্রের থিম-ভিত্তিক পানীয় চালুর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ৫০ লাখেরও বেশি কাপ বিক্রি হয়েছে।
চীনের বক্স-অফিস বাজারের বিশাল প্রভাব ইতিমধ্যেই হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরন বদলে দিয়েছে। চীনা দর্শকদের সন্তুষ্ট করা—এবং একই সাথে সমালোচনার বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল চীনা কেন্দ্রীয় সরকারের মন জয় করা—এখন হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণের এক অবিচ্ছেদ্য কৌশলে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালের ‘দ্য মার্শিয়ান’ (ঞযব গধৎঃরধহ) চলচ্চিত্রটির কথা মনে আছে? সেখানে দেখা গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে চীনের মহাকাশ সংস্থাটিই সংকট থেকে সবাইকে রক্ষা করছে। ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ট্রান্সফরমারস ৪’ (ঞৎধহংভড়ৎসবৎং ৪) চীনে ৩২০ মিলিয়ন ডলার আয় করে বক্স-অফিসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল—যা ছিল উত্তর আমেরিকায় ছবিটির আয়ের চেয়েও বেশি; এই ছবিটির কাহিনির একটি বড় অংশ হংকংয়ে চিত্রায়িত হয়েছিল এবং এতে প্রচুর চীনা পণ্যের প্রচার বা ‘প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট’ ছিল।
সর্বকালের সেরা দশটি সর্বাধিক আয়কারী দেশীয় চীনা চলচ্চিত্রের এক ঝলক এখানে দেওয়া হল—
১. দ্য ব্যাটল অ্যাট লেক চাংজিন (২০২১)
চীনা টাকায় ৫.৭৭ বিলিয়ন (প্রায় ৯১৩ মিলিয়ন ডলার) আয় করা এই মহাকাব্যিক যুদ্ধ চলচ্চিত্রটি কোরিয়ান যুদ্ধের সময় চোসিন জলাধারের যুদ্ধকে চিত্রিত করে, যা চরম পরিস্থিতিতে চীনা সৈন্যদের বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার উপর আলোকপাত করে।
২. উলফ ওয়ারিয়র ২ (২০১৭)
মোট: ৫.৬৮ বিলিয়ন (প্রায় ৮৭০ মিলিয়ন ডলার) উ জিং অভিনীত একটি অ্যাকশন-প্যাকড সিক্যুয়েল, এটি বিদ্রোহী এবং ভাড়াটেদের হাত থেকে জিম্মিদের উদ্ধারের জন্য আফ্রিকায় অভিযানে থাকা একজন চীনা সৈন্যের গল্প।
৩. হাই, মম (২০২১)
মোট: ৫.৪১ বিলিয়ন (প্রায় $৮২২ মিলিয়ন) জিয়া লিং পরিচালিত এবং অভিনীত, এই হৃদয়গ্রাহী কমেডি-নাটকটি তার নিজের জীবনের গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে একজন মেয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করতে এবং তার জীবন উন্নত করতে সময়ের সাথে সাথে ফিরে যায়।
৪. নে ঝা (২০১৯)
মোট: ৫.০২ বিলিয়ন (প্রায় $৭২৬ মিলিয়ন) এই অ্যানিমেটেড ফ্যান্টাসি ছবিটি নে ঝা-এর ক্লাসিক চীনা মিথের পুনরাবৃত্তি করে, যে ছেলেটি মন্দের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অনন্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
৫. দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ (২০১৯)
মোট: ৪.৬৮ বিলিয়ন (প্রায় $৬৯৯ মিলিয়ন) লিউ সিক্সিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী মহাকাব্যটিতে মৃতপ্রায় সূর্য থেকে বাঁচতে পৃথিবীকে একটি নতুন নক্ষত্রমণ্ডলে স্থানান্তরিত করার জন্য মানবজাতির প্রচেষ্টা চিত্রিত করা হয়েছে।
৬. ডিটেকটিভ চায়নাটাউন ৩ (২০২১)
মোট: ৪.৫২ বিলিয়ন (প্রায় $৬৮৬ মিলিয়ন) এই কমেডি-রহস্যময় চলচ্চিত্রটি গোয়েন্দা ট্যাং রেন এবং কিন ফেংকে অনুসরণ করে যখন তারা টোকিওতে একটি বড় মামলা সমাধান করে, যা হাস্যরস এবং জটিল প্লটে ভরা।

৭. ওয়াটার গেট ব্রিজ (২০২২)
মোট: ৪.১২ বিলিয়ন (প্রায় $৬২৬ মিলিয়ন) “দ্য ব্যাটল অ্যাট লেক চাংজিন” এর সিক্যুয়েল, এটি কোরিয়ান যুদ্ধের সময় চীনা সৈন্যদের নতুন চ্যালেঞ্জ এবং যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার গল্পকে অব্যাহত রেখেছে।
৮. অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম (২০১৯)
মোট: ৪.০৬ বিলিয়ন (প্রায় $৬১০ মিলিয়ন) যদিও চীনা ছবি নয়, “অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম” চীনে উল্লেখযোগ্য আয় করেছে, যা চীনা দর্শকদের মধ্যে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা প্রদর্শন করে।
৯. অপারেশন রেড সি (২০১৮)
মোট: ৩.৬৫ বিলিয়ন (প্রায় $৫৭৫ মিলিয়ন) ২০১৫ সালে ইয়েমেন থেকে চীনা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার উপর ভিত্তি করে তৈরি এই অ্যাকশন-যুদ্ধ চলচ্চিত্রটি চীনা নৌবাহিনীর সাহসিকতা এবং দক্ষতা তুলে ধরে।
১০. দ্য এইট হান্ড্রেড (২০২০)
মোট: ৩.১৩ বিলিয়ন (প্রায় $৪৭৪ মিলিয়ন) ১৯৩৭ সালে সাংহাইয়ের যুদ্ধের সময় প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই যুদ্ধ চলচ্চিত্রটি ৮০০ চীনা সৈন্যের দ্বারা অনেক বৃহত্তর জাপানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সিহাং গুদামের প্রতিরক্ষা চিত্রিত করে।
* ভ্যারাইটি, নিউয়র্ক ফিল্ম একাডেমি, হলিউড রিপোর্টার, দ্যা চাইনা টাইমস, টাইম ডট কম সহযোগিতায় প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আহমেদ তেপান্তর।
আজকালের খবর/আতে