সাদাত হাসান মান্টো বিংশ শতকের উপমহাদেশের প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক। যিনি একাধারে একজন উঁচুমাপের চিত্রনাট্যকার হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। আর সে সুবাদে ক্যারিয়ারে সুরের রানীখ্যাত নূর জাহানের সঙ্গেও জানাশোনা ছিলো। ২১ সেপ্টেম্বর ছিলো অবিভক্ত ভারতবর্ষের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত এই কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেত্রীর শততম জন্মবার্ষিকী। বাংলাভাষী পাঠক ও শ্রোতা-দর্শকের কাছেও তিনি সমান জনপ্রিয়। সমঝদার পাঠকের কথা মাথায় রেখে ইংরেজিতে ম্যাগগিল মারফির লেখা মান্টোর স্মৃতিকথা বাংলায় ঈশৎ সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন আহমেদ তেপান্তর—
নূর জাহানের সঙ্গে প্রথম দেখার স্মৃতিঘেঁটে মান্টো লিখেছেন— “আমার মনে হয়, ‘খানদান’ সিনেমাতেই আমি প্রথম নূর জাহানকে দেখেছিলাম। সে সময় তাকে ‘বেবি’ বলে ডাকা হতো; কিন্তু বিশ্বাস করুন, তাকে দেখে মোটেও কোনো ছোট বাচ্চার মতো মনে হতো না। বরং একজন তরুণীর শারীরিক গড়নের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন, তার সবই তার মধ্যে ছিল।”
‘কণ্ঠ না শারীরিক সৌন্দর্য’, সে বিতর্কের রেশে মান্টো লিখেছেন— “সে সময় চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মধ্যে নূর জাহান বেশ আলোড়ন ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। এর কারণ তার চেহারা বা শারীরিক গড়ন ছিল না; বরং তাঁর কণ্ঠস্বরই ছিল সেই বিপুল সাড়া জাগানোর মূল কারণ। সায়গলের পর নূর জাহানই ছিলেন সেই গায়িকা যিনি আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত নির্মল ও সুরের ঝংকার ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। আমার সবসময়ই মনে হতো, ওই মেয়েটি চাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা একটি সুর ধরে রাখতে পারতেন—ঠিক যেন কোনো দক্ষ অ্যাক্রোব্যাট, যিনি কোনো রকম টলমল না করেই টানটান দড়ির ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।”
লতা মঙ্গেশকরের উত্থানে নূর জাহানের অবস্থান নিয়ে মান্টো লিখেছেন- “নূর জাহানের কণ্ঠে সেই মিষ্টি ও তরুণসুলভ সুরের আমেজ আর নেই, যা একসময় তাঁর কণ্ঠকে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু নূর জাহান তো নূর জাহানই—তিনি অদ্বিতীয়। আজকাল লতা মঙ্গেশকরের জাদুকরী কণ্ঠের খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু নূর জাহানকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। তিনি যদি একটি সুরও তোলেন, তবে তাতে মনোযোগ দিতেই হয়।”
বহিঃর্বারনের অর্নামেন্টাল মোড়ানো ‘হৃদয়’। এ নিয়ে মান্টো লিখেছেন— “নূর জাহানের মধ্যে কিছুটা অহংবোধ আছে। এই অহংকারের যদি কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, তবে তা তাঁর জাদুকরী কণ্ঠস্বরের জন্য—শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য নয়। নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ে গর্ব করার অধিকার তাঁর নিশ্চয়ই আছে, যদিও অতিরিক্ত অহংকার কখনোই ভালো নয়।”
একবার আমরা যখন বোম্বেতে থাকতাম, “তখন আমার স্ত্রী নূর জাহানের প্রসঙ্গ তুললেন। তিনি বললেন, “উনি তো কতবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন। কিন্তু এখন আর আসেন না; অথচ আমার অনেক বান্ধবীই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চায়!”
আমি বললাম, “তিনি তো অনায়াসেই আমাদের এখানে আসতে পারেন। একবার নয়, হাজারবার আসতে পারেন।” তাই আমি তাঁর স্বামী শওকত হোসেন রিজভিকে বললাম, আর শওকত দু-একদিন পরেই তাঁকে আমাদের ওখানে পাঠিয়ে দিলেন।
জীবনে অনেক বিখ্যাত অভিনেত্রীর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছে, কিন্তু নূর জাহানের মতো এমন ভাব-গাম্ভীর্য বা কৃত্রিম আভিজাত্য আর কারও মধ্যে দেখিনি।
যা-ই হোক, নূর জাহান আমাদের বাড়িতে এসে সবার সাথে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু কিছুটা কৃত্রিম ভঙ্গিতে কুশল বিনিময় করলেন। আমি ভাবলাম নারীদের নিজেদের মতো করে কথা বলার সুযোগ দিতে আমার সরে যাওয়া উচিত; কিন্তু আমার স্ত্রীর এক বান্ধবী অনুরোধ করল আমি যেন থেকে যাই এবং নূর জাহানকে গান গাওয়ার জন্য রাজি করাই। তাই কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই নূর জাহানকে বললাম যে, অতিথিরা তাঁর কণ্ঠে দু-একটি গান শুনতে চাইছেন।
নূর জাহান বেশ আনুষ্ঠানিক সুরেই জবাব দিলেন: “না, মান্টো সাহেব, আমি পারব না। আমার গলাটা ভালো নেই।” একথা শুনেই আমার মেজাজ যেন কাবাবের মতো গরম হয়ে উঠল। আমি জানতাম তিনি কেবলই ভনিতা করছেন, তাঁর গলার কোনো সমস্যাই নেই। তাঁর গলা তো ইস্পাতের মতো—তা কখনোই নষ্ট হওয়ার নয়।
আমি বললাম, “নূর জাহান, এখানে ওই অজুহাত চলবে না। গলা যেমনই থাকুক না কেন, আপনাকে গাইতেই হবে।”
অনেক পীড়াপীড়ি আর আপত্তি-পাল্টা আপত্তির পর অবশেষে আমার স্ত্রী বললেন, “থাক না ওসব। ও তো গাইতে চাইছে না, তাহলে কেন জোর করছ?” কিন্তু আমিও তো কম একগুঁয়ে নই; তাই নূর জাহানকে আমি অনুরোধ করেই চললাম, যতক্ষণ না তিনি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের একটি গজল গাইতে শুরু করলেন: “আজ কি রাত সাজ-এ-দর্দ না ছেড়” (আজ রাতে বেদনার সুর তুলো না)। এত বছর পরেও সেই মধুমাখা কণ্ঠস্বর যেন আমি আজও শুনতে পাই।
নূর জাহানের অগণিত ভক্ত রয়েছে। আমি এমন অনেক রাঁধুনিকে চিনি যারা উনুনের ওপর তাঁর ছবি ঝুলিয়ে রাখে এবং মনিব-মালকিনদের জন্য খাবার তৈরির সময় গলা ছেড়ে তাঁর গান গায়। এমন গৃহভৃত্যদেরও আমি চিনি যারা নোমি, নার্গিস বা কামিনী কৌশলকে পছন্দ করে না ঠিকই, কিন্তু নূর জাহানের প্রেমে একেবারে পাগল। তাঁর কোনো ছবি পেলেই তারা সেটা কেটে নিয়ে নিজেদের ভাঙা টিনের বাক্সে আটকে রাখে, যাতে অবসর সময়ে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ জুড়াতে পারে।
নূর জাহানের একনিষ্ঠ ভক্তদের একজন আমার বাড়িতেই থাকে। কোনো সুন্দরী মেয়ে, কনে কিংবা লাল পোশাক পরা কোনো নারীকে দেখলেই সে তাকে ‘নূর জাহান’ বলে ডাকে। নূর জাহানের প্রায় সব গানই তার মুখস্থ। সে নিজেও বেশ সুদর্শন; তাই নূর জাহানের মধ্যে সে এমন কী সম্মোহনী আকর্ষণ খুঁজে পায়—যার জন্য দিন-রাত কেবল তাঁরই গুণগান গাইতে থাকে—তা আমার বোধগম্য নয়।
এই তরুণটি আমার খুব প্রিয়। সে আমার ভাইপো ও ভাবীর ছেলে। তার নাম শহীদ জালাল, তবে আমরা সবাই আদর করে তাকে ‘টাকু’ বলে ডাকি। নূর জাহানকে নিয়ে এমন আচ্ছন্নতা বা পাগলামি ছাড়ার জন্য আমরা সবাই তাকে অনেক বুঝিয়েছি; বলেছি, “দেখো, তিনি তো বিবাহিত এবং সন্তান-সন্ততির মা, তাঁকে বিয়ে করা তো তোমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।” কিন্তু টাকু নূর জাহানকে ভালোবেসেই চলেছে।
টাকুর দাদা মিয়া জালালুদ্দিন শওকত রিজভির সাথে দেখা করে বললেন: “দেখুন, আপনার স্ত্রীর এক ভক্ত আছে যে তার প্রেমে একেবারে পাগল। ঈশ্বর না করুন, কোনো একদিন সে হয়তো তাকে নিয়ে পালিয়েই যাবে!”
মিয়া সাহেবের এই কথায় শওকত বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। অবশেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মিয়া সাহেব, কে সেই ব্যক্তি?”
মৃদু হেসে মিয়া সাহেব উত্তর দিলেন: “সে আমার নাতি।”
“আপনার নাতি? তার বয়স কত?”
“ওহ, বছর চারেক হবে,” মিয়া সাহেব জবাব দিলেন।
এই গল্প শুনে নূর জাহান অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। ঘোষণা দিলেন তিনি সেই ক্ষুদে ভক্তের সঙ্গে দেখা করবেন। শুনে শহীদ জালাল খুব খুশি হলেন এবং নূর জাহান কবে তার বধূ হবেন—সেই দিনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন গুনতে লাগলেন।
নাপিত ভক্তের প্রচলিত মিথ নিয়ে মান্টো লিখেন, নাপিতের পেশায় নিয়োজিত এক সুদর্শন তরুণ। তিনি সবসময় নূর জাহানের গান গাইতেন এবং তাঁর সিনেমার সংলাপ আওড়াতেন। একবার কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সত্যিই নূর জাহানের প্রেমে পড়েছ?”
নাপিত অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে উত্তর দিলেন: “এ নিয়ে কি কোনো সন্দেহ আছে?” তাঁর বন্ধু তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন: “যদি সত্যিই প্রেমে পড়ে থাকো, তবে পাঞ্জাবি লোকগাথার সেই মহান প্রেমিক মাহিনওয়ালের মতো নিজের শরীর থেকে এক টুকরো মাংস কেটে কাবাব বানিয়ে তাঁর কাছে পাঠাতে কি তুমি রাজি?”
নাপিত একটি ধারালো ক্ষুর বের করে বন্ধুর হাতে দিয়ে বললেন, “আমার শরীরের যেকোনো অংশ থেকে মাংস কেটে নাও।” কথামতো নাপিতের বন্ধু এক টুকরো মাংশ কেটে নিয়ে পালিয়ে গেল। ওদিকে নাপিত বেচারা অজ্ঞান! মেয়ো হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তাঁর মুখ দিয়ে প্রথম যে শব্দটি বেরিয়ে এল, তা হলো— “নূর জাহান।”
আজকালের খবর/আতে