জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীর আবাসিক হল বিদ্রোহী হলে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনায় ৬১টি ত্রুটি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০টি লাইট ও ৩১টি সুইচবোর্ড রয়েছে। কোথাও লাইট ও সুইচ অচল, আবার কোথাও দেয়াল থেকে সুইচবোর্ড খসে পড়ে বৈদ্যুতিক তার উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। এতে দৈনন্দিন ব্যবহারে ভোগান্তির পাশাপাশি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
হলের বিভিন্ন ফ্লোরের বাথরুম ও ওয়াশরুম সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ৩১টি সুইচবোর্ড দেয়াল থেকে খসে পড়েছে। এসব বোর্ডের পেছনে থাকা লাল ও কালো বৈদ্যুতিক তার অরক্ষিত অবস্থায় ঝুলছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় বোর্ডগুলোর পেছনের ধাতব ব্যাকবক্সে জং ধরেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রু দিয়ে সুইচবোর্ড আটকে রাখার ভিত্তিও নষ্ট হয়ে গেছে। বোর্ড খসে পড়ায় এর সঙ্গে সংযুক্ত লাইটসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও বিকল হয়ে পড়ছে।
বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে শিক্ষার্থী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হলের তৃতীয় তলার একুশে ব্লকের পশ্চিম পাশের একটি ওয়াশরুমে লাইট জ্বালানোর সুইচ অন করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক শকের শিকার হন ইইই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. লুৎফুজ্জামান প্রত্যাশা। তার দাবি, শকের তীব্রতায় তিনি মাটিতে পড়ে যান। ঘটনার আগে ওই সুইচের ত্রুটির বিষয়ে হল প্রশাসনকে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সুইচটি মেরামত করা হয়েছে বলে জানান প্রত্যাশা। একই ফ্লোরের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও ওই সুইচ থেকে শকের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
হলের বৈদ্যুতিক সকেট নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ইতিহাস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নীরব কুমার দাস জানান, তার কক্ষের কয়েকটি সকেটে সংযোগ দেওয়ার সময় আলো বা স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়। ওয়াশরুমের একটি সকেট ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব সমস্যা একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে হলের বিভিন্ন বাথরুম ও ওয়াশরুমে ৩০টি লাইট অচল রয়েছে। লাইট ও সুইচ অচল থাকায় রাতে বাথরুম ও ওয়াশরুম ব্যবহারে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
মার্কেটিং বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত দে জানান, হলের নবম তলার একাত্তর ব্লকের বাথরুমের সুইচবোর্ড ভাঙা থাকায় লাইটটি সবসময় জ্বলতে থাকে। এতে বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। একই ব্লকের ভেতরের গোসলখানার একটি লাইট নষ্ট থাকায় ৩৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি গোসলখানা সচল রয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব সমস্যা একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বৈদ্যুতিক ত্রুটির পাশাপাশি লিফট নিয়েও দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ১০ তলা ভবনটিতে চারটি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তলার ডান পাশের দুটি লিফটের কল বাটন প্রায় পাঁচ মাস ধরে অচল বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। আগে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বাম পাশের দুটি লিফটের কল বাটনও অচল ছিল। তবে হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে, গ্রাউন্ড ফ্লোরের ওই লিফটের বাটনটি মেরামত করা হয়েছে; অন্যান্য ত্রুটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, রাত ১১টার পর বাম পাশের দুটি লিফট বন্ধ রাখা হয় এবং ডান পাশের মাত্র একটি লিফট চালু থাকে। রিডিং রুম বা অন্যান্য জরুরি কাজ শেষে ফ্লোরে ফিরতে তখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এতে ভোগান্তি বাড়ে।
লিফটগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ কেজি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সীমিত সংখ্যক লিফট চালু থাকায় ব্যস্ত সময়ে একটি লিফটে একসঙ্গে বেশি যাত্রী ওঠেন। এতে লিফট ব্যবহারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
তবে হল প্রশাসনের দাবি, এসব ত্রুটির বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে আগে ছিল না। বিদ্রোহী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম জানান, কোনো শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে হল প্রশাসন তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করে। বৈদ্যুতিক ত্রুটিগুলোর বিষয়ে এখন বিস্তারিত জানতে পেরেছেন এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
লিফটের কল বাটনের বিষয়ে প্রভোস্ট জানান, নতুন বাটন অর্ডার করা হয়েছে। বাটন হাতে পৌঁছালে দ্রুত মেরামত করা হবে।
তবে ত্রুটিপূর্ণ সুইচবোর্ড, উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারিগরি কারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রকৌশল দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক) মো. আসাদুজ্জামান আসাদ এবং সহকারী প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক) জান্নাতুন নাঈমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্রোহী হলটি ২০২২ সালে উদ্বোধনের কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সুইচবোর্ডে এমন ত্রুটি দেখা দেওয়ায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আজকালের খবর/বিএস