বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ। তিনি যেন আসলেন আর জয় করে নিলেন কোটি ভক্তের হৃদয়। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বাঁক ঘোরানো তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা ও ফ্যাশন আইকন ছিলেন সালমান শাহ। ঢালিউড সিনেমার অমর নায়কও তিনি।
তার অকালপ্রয়াণের তিন দশক পরও সেই ভালোবাসায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সালমান শাহ হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের নস্টালজিয়ার অন্যতম নাম। তার সিনেমা মানে নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিকতা, তারুণ্যের আবেগ আর দর্শকের ভালোবাসায় ভরা এক স্বর্ণালি অধ্যায়।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) এই স্বপ্নের নায়ককে হারানোর ২৯ বছর।
মাত্র ২৫ বছর বয়সেই ১৯৯৬ সালের আজকের এই দিনে অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সালমান শাহ। তার মৃত্যুবার্ষিকী এলেই যেন বিশেষ শহরের দাড়িয়া পাড়ার নানার বাসাতে তার ভক্তদের আসা যাওয়াটা একটু একটু করে বাড়তেই থাকে। কারণ এই বাসাতেই অর্থাৎ এই ‘সালমান শাহ হাউজ’-এ কেটেছে সালমানের ছোটবেলা।
দূরন্ত সময়টা তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন। জানালেন তার মামা কুমকুম। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস সৃষ্টিকারী নায়ক সালমান শাহ। দেখতে দেখতে তার মৃত্যুর ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে। মৃত্যুর এত বছর পরও তিনি এখনো আকাশচুম্বী জনপ্রিয়, এখনো দর্শকের প্রিয় নায়ক তিনিই। এখনো টিভি পর্দায় তার সিনেমা প্রচার হলে দর্শক আগ্রহ নিয়ে দেখেন। এখনো তার অভিনীত সিনেমার গান টিভিতে প্রচার হলে দর্শক তা এড়িয়ে যেতে পারেন না। ডিজিটাল ম্যাপ দেখুন
এমনও দেখা গেছে পাশাপাশি দুটি চ্যানেলের একটিতে নতুন কোনো সিনেমা প্রচার হচ্ছে, আবার অন্যটিতে সালমান শাহ’র সিনেমা। তখন দর্শক যেন সালমান শাহ’র সিনেমা দেখার প্রতিই বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবার শুধুমাত্র সালমান শাহ’র সিনেমার ক্ষেত্রেই এমন দেখা গেছে যে, সিনেমা প্রচারের সময় নারী পুরুষ দর্শক শুধু সালমান শাহ’র পারফর্ম্যান্সই বেশি উপভোগ করেন। তার সঙ্গে কে আছেন তা কখনোই জরুরি কোনো বিষয় নয় দর্শকের কাছে।
মৃত্যুর এত বছর পরও সালমান শুধুমাত্র তার দুর্দান্ত অভিনয় এবং ফ্যাশনে ভিন্নমাত্রা দিয়েই আজো দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে আছেন। সবার প্রিয় নায়ক সালমান শাহ’র জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায়। তার পিতার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী। সালমানের দাদার বাড়ি সিলেট শহরের শেখঘাটে আর নানার বাড়ি দারিয়া পাড়ায়।
যে বাড়ির নাম এখন ‘সালমান শাহ হাউজ’। তার নানা তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ে সালমানও তাই সেই নানার কারণেই আসা। স্কুলে পড়ার সময় সালমান বন্ধুমহলে সংগীতশিল্পী হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে পাস করেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রে আসার আগেই ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট বিয়ে করেন। স্ত্রী ছিলেন সামিরা হক।
যদিও বা সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয় করেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পান সালমান শাহ। কিন্তু তার আগেই তিনি নাটকে অভিনয় করেন। মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক ‘পাথর সময়’-এ একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সালমান শাহ’র অভিনয় জীবন শুরু হয়। ওই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে তৌকীর আহমেদ অভিনয় করলেও সালমান শাহ’র চরিত্রটি ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে আরো বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেও দারুণ প্রশংসিত হয়েছিলেন সালমান। সিনেমার পাশাপাশি নাটকেও তার উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে ভীষণ সাড়া ফেলেছিল। স্মার্ট টিভি বাছুন
যদিও বা মৌসুমীর সঙ্গে সিনেমাতে সালমানের অভিষেক হয়। পরবর্তীতে মৌসুমীর সঙ্গে আরো দুটি সিনেমা ‘স্নেহ’, ‘অন্তরে অন্তরে’তে অভিনয় করলেও আর কোনো সিনেমাতে তাদের দেখা যায়নি। শাবনূরের সঙ্গেই বেশি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। যে জুটিকে এখনো সিনেমার অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
সালমান শাহের সঙ্গে জুটি হয়ে আরো অভিনয় করেছিলেন শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চি।
সালমানের মৃত্যুর এত বছর পরও পরবর্তীতে বাংলা সিনেমাতে অনেক নায়কের আবির্ভাব হলেও অভিনয় আর ফ্যাশন দিয়ে আর কোনো নায়ক আজ পর্যন্ত সালমান শাহর জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি, অনেক চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিচালকের ভাষ্যমতে সালমান শাহ ছিলেন ধুমকেতুর মতো, এলেন দেখলেন জয় করলেন আবার চলেও গেলেন।
কোনো নায়কের মৃত্যুর এতো বছর পরেও ভক্তদের হৃদয়ে এতটা ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো দেশের কোনো নায়কের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। যে সময়টাতে সালমান চলে গেলেন, সেই সময়টাতে যারা ছোট ছিলেন, তাদের কাছেও ছোটবেলার গল্পের বিষয় ছিলেন সালমান শাহ। তারাও মনে মনে স্বপ্ন দেখেন, ইস! যদি একবার ফিরে আসতেন সালমান শাহ। কিন্তু মৃত্যুই সত্য, যে চলে যাবার সে চলেই যায় আর ফিরে আসেনা কোনোদিন।
আজকালের খবর/বিএস