প্রবাসী বাংলাদেশিরা দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন; শ্রম সহযোগিতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, পর্যটন, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ।
ঢাকা/মালে, ১৬ জুলাই ২০২৬: বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন এবং গভীর জনগণ-থেকে-জনগণ যোগাযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ করেছেন মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে দেশটি অনেকাংশেই ‘দ্বিতীয় বাড়ি’র মতো।
মালদ্বীপের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সান অনলাইন’-এর ‘ডিপ্লোম্যাটিক ফোকাস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাইকমিশনার বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তি তুলে ধরেন এবং দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ ও ঘনিষ্ঠ মানবিক সম্পর্ককে ভিত্তি করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ড. মো. নাজমুল ইসলাম বাংলাদেশি প্রবাসীদের দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্মাণ, পর্যটন ও সেবা খাতসহ মালদ্বীপের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তাদের শ্রম, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব আরও গভীর করতে সহায়তা করছে।
হাইকমিশনার বলেন, “এই প্রবাসীরাই প্রকৃতপক্ষে দুই দেশের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করছেন।” তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
‘পাওয়ার অব বন্ডিং’ বা সম্পর্কের শক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস উদযাপন, কমিউনিটি আউটরিচ এবং বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল সরকার-থেকে-সরকার পর্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমেও এ সম্পর্ক ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে।
হাইকমিশনার একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি অবৈধ বা অনিবন্ধিত প্রবাসীদের নিয়মিতকরণ, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শ্রম সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করলেও ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্ককে এখন আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, মৎস্য, পর্যটন, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এসব ক্ষেত্রে আরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, দুই দেশের পরস্পর-পরিপূরক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ও একাডেমিক বিনিময়, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, মৎস্য ও ব্লু ইকোনমি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন ইতোমধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ততার বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে মালদ্বীপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ তারিখে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকে দুই দেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন স্বার্থ ও জনগণ-থেকে-জনগণ সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। সময়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং মালদ্বীপে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায় এ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় পরিণত হয়েছে।
হাইকমিশনার পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার মালদ্বীপের সঙ্গে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে বিদ্যমান বন্ধুত্ব ও জনগণের মধ্যকার গভীর যোগাযোগকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপান্তরের মধ্যে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন সমৃদ্ধি, পারস্পরিক উন্নয়ন এবং আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনারের মতে, ‘পাওয়ার অব বন্ডিং’—অর্থাৎ আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক যোগাযোগ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক—বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ভবিষ্যতেও কাজ করবে।
আজকালের খবর/ এমকে