মঙ্গলবার ৪ আগস্ট ২০২৬
চিনিকলগুলো বাঁচাতে প্রয়োজন স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ডলার সাশ্রয়
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫৬ পিএম   (ভিজিট : ২০)
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার বা ডলারের রিজার্ভ ধরে রাখা। আর এই রিজার্ভ সুরক্ষার একটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে আমাদের দেশীয় চিনি শিল্প। অথচ বছরের পর বছর ধরে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলোর ধারাবাহিকভাবে লোকসান, তীব্র আখ সংকট এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। যেখানে সামান্য কিছু নীতিগত সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে আমরা চিনি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতাম, সেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার চিনি আমদানি করতে গিয়ে আমাদের মূল্যবান ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। চিনি আমদানি বন্ধ হলে যে বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় হবে, তা দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়-আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দিকে তাকালে একটি বাস্তবমুখী চিত্র ফুটে ওঠে। 

ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, আখের জমির মাটির গুণাগুণ এবং সামগ্রিক আবহাওয়া বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সাথে ওপার বাংলার কোনো তফাত নেই। একই মাটিতে এবং একই আবহাওয়ায় চাষ করে পশ্চিমবঙ্গের চিনি কলগুলো লাভের মুখ দেখছে। শুধু তাই নয়, উচ্চ ফলন নিশ্চিত করে তারা চিনি শিল্পকে চাঙা রাখছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, একই সম্ভাবনাময় পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আমরা নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছি না এবং শেষ পর্যন্ত ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে চিনি আমদানি করতে হচ্ছে। ভারতের চিনি কলগুলো যদি একই জলবায়ুতে লাভজনক হতে পারে, তবে আমাদের দেশে কেন লোকসানের এই ধারা অব্যাহত থাকবে ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আমাদের দেশের চিনি শিল্পের প্রকৃত সংকটের চালচিত্র দেখতে খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারন উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রাণস্পন্দন হিসেবে পরিচিত নাটোরের দুই রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল—নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ও নাটোর সুগার মিলের বর্তমান অস্তিত্ব সংকটই এর বড় প্রমাণ। লোকসানের পরিমাণ ইতোমধ্যে শতকোটি টাকার ঘর ছাড়িয়েছে। গত মাড়াই মৌসুমে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৪১ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে মাত্র ৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করতে পেরেছে। 

অন্যদিকে, নাটোর সুগার মিলের অবস্থা আরও করুণ—৯৫ হাজার ১৫০ টন আখ মাড়াই করে মাত্র ৫ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় আয় আশঙ্কাজনকভাবে কম হওয়ায় এবং ঋণের কিস্তি ও সুদের টাকা মেটাতে গিয়ে মিলগুলোর আর্থিক ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এই অচলাবস্থার পেছনে মূল কারণ আখ চাষিদের ক্ষোভ, হতাশা ও চাষ পরিবর্তনের প্রবণতা। স্থানীয় আখচাষিদের বক্তব্য এ দেশের সামগ্রিক চিনি শিল্পের অব্যবস্থাপনাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তারা স্পষ্ট বলেছেন, "আখ চাষে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। আবার যখন টাকার প্রয়োজন হয়, তখন ইচ্ছামতো ফসল তুলে সরবরাহ করা যায় না। মূলত মিলের অব্যবস্থাপনা, সময়মতো টাকা পরিশোধ না করা এবং বাইরের তুলনায় দাম কম পাওয়ায় মিলে আখ সরবরাহ কমে গেছে। অন্য আরো চাষিদের মতে, আখের চেয়ে অন্যান্য ফসল অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে বিকল্প চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, মিল জোনের উঁচু ও উর্বর জমিগুলোতে এখন কৃষকরা অন্য ফসল ফলাচ্ছেন আর নিচু জমিতে বাধ্য হয়ে আখ চাষ হচ্ছে। যেখানে আখের ফলন ও চিনি আহরণের হার (রিকভারি রেট) দুই-ই কম। বাস্তবতা হলো, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে গত বছরের ১৮ হাজার ৭১ একর আখের জমি চলতি বছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৮ একরে। নাটোর সুগার মিলেও চাষের জমি কমেছে ৭৫০ একর। এর ওপর যুক্ত হয়েছে মিলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল টানাটানির প্রতিযোগিতা। 

কৃষিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনি কলগুলোর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, উন্নত জাতের আখের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই চাষিরা আজ আখ চাষে বিমুখ। দেশের চিনি শিল্প নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের ‘দোটানা’ ভাব কাজ করছে। বন্ধ চিনিকলগুলোতে দেনা ও দুর্ভোগের বোঝা কেবলই বাড়ছে, যেখানে একটি বন্ধ চিনিকল রক্ষণাবেক্ষণ করতেই মাসে ব্যয় হয় প্রায় ২৪ লাখ টাকা। অথচ আশার কথা হলো, এই খাতে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং সুযোগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের চিনি শিল্পের চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব। তাই জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে চিনি শিল্পকে অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, যাতে এক ছটাক চিনিও বাইরে থেকে আমদানি করতে না হয়। চিনি কলগুলোকে লাভজনক করার চেয়েও এই মুহূর্তে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত 'ব্রেক-ইভেন' বা 'নো-লস, নো-প্রফিট' নীতিতে চালানো। তাছাড়া, চিনি শিল্প একা বাঁচে না। এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে উপজাত (বাই-প্রোডাক্টস) ভিত্তিক অন্যান্য শিল্প। যেমন ডিস্টিলারি, জৈব সার, বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। 

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলো বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে এই সহযোগী শিল্পগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানকে বিপন্ন করবে। এসব সংকট উত্তরণে কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। 

প্রথমত: চিনিকলগুলোর আধুনিকায়ন করা। অর্থাৎ পুরনো ও জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি পাল্টিয়ে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রবর্তন করতে হবে, যাতে আখ থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ চিনি আহরণ করা সম্ভব হয় এবং উৎপাদন ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 

দ্বিতীয়ত: কৃষকদের জন্য আখের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও দ্রুত পরিশোধ করা। অর্থাৎ চাষিদের ধরে রাখতে এবং উদ্বুদ্ধ করতে হলে আখের বাজারমুখী ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি চাষির অ্যাকাউন্টে দ্রুত টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের ক্ষোভ দূর হয় এবং চিনিকলগুলোর প্রতি আস্থা তৈরী হয়। 

তৃতীয়ত: উচ্চফলনশীল জাতের বীজ ও নিবিড় চাষাবাদ পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন ভারতের মতো উচ্চফলনশীল এবং দ্রুত পরিপক্ব হয় এমন আখের জাত উদ্ভাবন ও তা কৃষকদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। নিচু জমির পাশাপাশি উর্বর জমিতেও যেন কৃষকরা আখ চাষে উদ্বুদ্ধ হন, সে জন্য সার, বীজ ও কীটনাশকের বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।

চতুর্থত: উপজাতের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিম্চিত করতে হবে। শুধু চিনির ওপর নির্ভর না করে আখের ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ এবং মোলাসেস থেকে ইথানল ও জৈব সার উৎপাদন করে মিলগুলোর বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। এছাড়া আরো বেশ কয়েকটি ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ভাবে সরকারকে ভাবতে হবে এবং বাস্তবায়নের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলতে চাই-প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪০০০ থেকে ৫০০০ কোটি টাকার মিহি চিনি আমদানি করা হয়। যেখানে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সুগার মিলগুলো সুচারুভাবে পরিচালনা করলে বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার বাইরে যাবে না এবং চিনি আমদানি করতে হবে না। 

পঞ্চমত: দেশেই পরিশোধন প্ল্যান্ট স্থাপন করা প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, দেশের একমাত্র দেশবন্ধু সুগার মিলের মাধ্যমে পরিশোধন প্ল্যান্ট করা যেতে পারে, যা নদীর ধারে অবস্থিত এবং সুচারুভাবে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে চালাতে পারলে চিনি শিল্প কর্পোরেশনের সমন্ত ক্ষতি বা লোকসান অল্প সময়ের মধ্যে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। 

ষষ্ঠত: মোলাসেস আমদানি হ্রাস ও রপ্তানি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ চিনিকল বন্ধের কারণে দেশে গো-খাদ্য তৈরির জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকার মোলাসেস আমদানি করতে হয়। অথচ দেশের ভেতরে মিলগুলো চালু থাকলে আর আমদানির প্রয়োজন হবে না। উপরন্তু প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মোলাসেস রপ্তানি করা সম্ভব হবে। 

সপ্তমত: ডিস্টিলারির সুরক্ষা নিশ্চিতসহ ব্যবসায়ীক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এখানেও বলা বাহুল্য- চিনি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল একমাত্র ডিস্টিলারারিটি দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা জেলাতেই অবস্থিত। উক্ত ডিস্টিলারারি থেকে প্রতি বছর ট্যাক্স-ভ্যাট এবং লাভসহ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় করে সরকার। এখন সুগার মিলগুলো চালু না থাকলে উক্ত ডিস্টিলারারি অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে এবং সরকার প্রতিবছর উক্ত ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হবে। 

অষ্টমত: যৌথ উদ্যোগে ডিস্টিলারারি স্থাপন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ বিদ্যমান। তাই চিনি শিল্পের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি ডিস্টিলারারি বিদেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থাপন করলে যার সম্পূর্ণ পণ্য বাইরে রপ্তানি হবে। এখান থেকে প্রতি বছর ৫০০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভাণ্ডারে আনা সম্ভব। তাই সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উল্লিখিত বৈচিত্র্যকরণের দিকসহ আখের ভালো জাত আমদানির ওপর নজর দিলে এবং চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন করা হলে দেশের চিনি শিল্পের অতীত গৌরব অচিরেই ফিরে আনা সম্ভব। কারণ, বাংলাদেশ চিনি শিল্পের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দেশ। এজন্য নাটোরের দুই চিনিকলসহ দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে লোকসানের ধারা থামাতে হবে। আর না পারলে আগামী দিনে আখের উৎপাদন আরও তলানিতে ঠেকবে এবং ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানগুলো চিরতরে বিলুপ্তির মুখে পড়বে। তাই বলবো-ডলারের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে চিনি কলগুলোকে বাঁচিয়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারের নীতিনির্ধারক তথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এই জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকরী রোডম্যাপ গ্রহণ করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আজকালের খবর/বিএস 









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft