
ঢোলের গম্ভীর আওয়াজ, কাঁসার ঘণ্টার ছন্দময় ঝংকার আর লাঠির ঠকঠক শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার দেওগ্রাম। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার মেলা ঘিরে গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ। লাঠিয়ালদের ক্ষিপ্র চাল, প্রতিপক্ষের আঘাত ঠেকানোর কৌশল আর দর্শকদের করতালিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর তিন দিন পর পশ্চিম দেওগ্রামে বসে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই আয়োজন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে টিকিয়ে রেখেছে।
আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে গ্রামবাংলার অনেক লোকজ খেলা ও উৎসব হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে দেওগ্রামের লাঠিখেলার মেলা এখনো ধরে রেখেছে অতীতের ঐতিহ্য। মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামসহ দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ। লাঠিয়ালদের খেলা দেখতে মাঠের চারপাশে ভিড় করেন শিশু-কিশোর, তরুণ ও প্রবীণ দর্শক। খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে মুগ্ধ দর্শকদের করতালি ও উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলাঙ্গন।
লাঠিখেলার পাশাপাশি মেলায় বসেছে নানা পণ্যের দোকান। মিষ্টি, প্রসাধনী ও গৃহস্থালির সামগ্রী কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বাড়তি কর্মব্যস্ততা। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মেলায় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
গ্রামের প্রায় নব্বই বছর বয়সী প্রবীণ মোজাম্মেল হোসেনের কাছে এ মেলা কেবল বার্ষিক আয়োজন নয়, বরং শৈশব থেকে বয়ে চলা স্মৃতির অংশ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ মেলার নানা পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। মেলাকে ঘিরে গ্রামবাসীর ঘরে ঘরে খই, মুড়ি, নাড়ু ও মাংস-ভাত দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের প্রচলনও রয়েছে।
প্রবীণ লাঠিয়াল শহিদুল জানান, লাঠিখেলা তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বাবা-দাদার কাছ থেকে এ খেলার শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। ১৯৮০ সাল থেকে এই বিদ্যা ধরে রেখেছেন বলে জানান তিনি।
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। তবু দেওগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার মেলা প্রমাণ করছে, গ্রামীণ জনপদে লোকজ সংস্কৃতির আবেদন এখনো অমলিন। লাঠির প্রতিটি ঘূর্ণি আর ‘ঠা ঠা ঠকঠক’ শব্দে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে বাংলার শেকড়ের ইতিহাস।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব