জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হলেও সন্ধ্যায় তা দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আঘাত পান। একই ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় এক সাংবাদিকের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে এ ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষার্থীদের কয়েকজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁদের সহপাঠীরা। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। মাঠের এক পাশে ফুটবল খেলছিলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। ফুটবল ক্রিকেট খেলার এলাকায় চলে গেলে তা আনতে গিয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের সিফাত নামের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্যদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় গালাগালের অভিযোগও ওঠে।
পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার একপর্যায়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শুভর মাথায় পেছন থেকে এক শিক্ষার্থী চড় মারেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়, যা পরে মারামারিতে গড়ায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সন্ধ্যা ৭টার দিকে আবারও সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় এক পক্ষের কয়েকজনের হাতে রড ও দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা এবং চারুকলাসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হন।
এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং তা দ্বিতীয় দফায় ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরটিভি প্রতিনিধি আবু তাহের মণ্ডল। তাঁর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আহত শিক্ষার্থীদের প্রথমে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাত ৮টার পর তাঁদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের রুবিউল এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের সাকিবের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। তাঁদের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সহপাঠীরা।
এ ছাড়া লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের রাফি এবং চারুকলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের রোমান মাথায় আঘাত পেয়েছেন বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের দিদার নামের আরেক শিক্ষার্থী হাসপাতালে ব্যান্ডেজ করানোর পর অ্যাম্বুলেন্সে চলে যান বলে দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহত শিক্ষার্থীরা আশঙ্কামুক্ত। তবে তাঁরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী এবং প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান জনিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা হয়।
এ সময় সংঘর্ষের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এর আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান জনিসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। প্রক্টরিয়াল বডির এক সদস্যের ভাষ্য, তাঁরা সেখানে গিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখতে পান এবং দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় এক পক্ষ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন