প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১২ পিএম (ভিজিট : ২৭)
ভস্মীভূত গৌরিপুর ঐতিহাসিক সিনেমা হল
ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত নয় দশকের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ এবং ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক সোয়া ২টার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কর্মকর্তার দাবি এটি পরিত্যক্ত সিনেমা হল, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গোডাউন ভাড়া দেওয়া হয়েছিলো।
গৌরীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ইনচার্জ বা স্টেশন অফিসার হলেন মো. খবিরুল আলম মুঠোফোনে আজকালের খবরকে জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ সিনেমা হলের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়- স্থানীয়দের কাছ থেকে মুঠোফোনে এমন খবর পেয়ে তারা ঘটাস্থলে যান। তারা সেখানে গিয়ে আগুনের লেলিহানশিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো শোল কাঠের তৈরি ঐতিহাসিক মঞ্চ কাঠামোকে গ্রাস করে ফেলে। অবস্থা বেগতিক আঁচ করতে পেরে ঘটনাস্থলে আরো তিনটি মোট চারটি ইউনিট েআগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। পরে পাঁচ ঘন্টার চেষ্টা সকাল সোয়া ৭টায় আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
তিনি জানান, অবকাঠোমোতে গ্যাস সিলিন্ডার এবং কাঠের ফার্নিচারসহ ১৫-২০টি দোকান ছিলো। অবকাঠোমোটি ঐতিহাসিক আবার দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। ভস্মীভূত হওয়ার ফলে এটা আর ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক চোখে মনে হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে। তবে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা আগুন লাগার প্রকৃত কারণ কী তা তদন্ত না করে বলা যাচ্ছে না।
ধ্বংসের স্তূপে বিংশ শতাব্দীর এক নান্দনিক শিল্পকর্ম : এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে শুধু কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, বরং চিরতরে হারিয়ে গেল ময়মনসিংহের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। বিংশ শতাব্দীর ৩০-এর দশকে এই অনিন্দ্যসুন্দর নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে, প্রখ্যাত সঙ্গীত ও নাট্যপ্রীতিতে অনন্য ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী।
কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘স্টার থিয়েটার’-এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও কাঠের নান্দনিক কাঠামো বীরেন্দ্র কিশোরকে মুগ্ধ করেছিল। সেই অনুকরণেই তিনি নিজ জন্মভূমি গৌরীপুরে শোল কাঠ দিয়ে এই নয়নাভিরাম থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার পর ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই হলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। একসময় দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় মুখরিত থাকত এই নাট্যমঞ্চ। সর্বশেষ ১৯৪৬ সালে প্রখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস ও পাহাড়ী স্যানাল এই মঞ্চে অভিনয় করেছেন বলে গৌড়ীপুরের রাজনৈতিক গবেষক রনজিৎ করের ভাষ্য।
পরবর্তীতে নাট্যমঞ্চ থেকে সিনেমা হল পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এটি সরকারি মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়। এরপর চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে বিনোদনের প্রসারে হলটি লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি স্থানীয়ভাবে ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’। আর সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে নতুন প্রজন্মের কাছে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
স্থানীয়দের দাবি ও ক্ষোভ : ঐতিহাসিক এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসন ও প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, অনতিবিলম্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হোক।
এ নিয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে একাধিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। কেন কিভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।’
গণমাধ্যমকে তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে এটি লিজে ছিল। দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না থাকায় লিজধারীকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন সব কিছুই খোঁজ নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা আজকালের খবরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ঝলমল প্রতিষ্ঠানটি অব্যহৃত ছিলো। বলা যায় পরিত্যক্ত ছিলো। ফলে এটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় প্রশাসন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটিকে গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়ে কিছু আয়ের চেষ্টা করেছে, এটাই নিয়ম। তবে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি বলেও তিনি মত দেন।
ঐতিহাসিক স্থাপনা অলাভজনকরে অজুহাতে এভাবে ভাড়া দিতে পারে কিনা বা পারলেও সেখানে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধ্বংসের সুযোগ তৈরি হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাব ওই কর্মকর্তা এড়িয়ে যান।
অপরদিকে , অ্যাকাডেমি অব ফিল্ম এন্ড মিডিয়ার নির্বাহী পরিচালক বিবেশ রায়, এই দুর্ঘটনার/ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এভাবে ঐতিহ্য অর্থনিতিক লাভালাভের টানাহেঁচড়ায় নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে আরো সচেতন হতে হবে নয়তো সব কিছুই এক সময় গোডাউন হয়ে যাবে।
গণমাধ্যমকর্মী ও চলচ্চিত্র গবেষক আহমেদ তেপান্তর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাশিয়া ১১৯ বছর ধরে তাদের প্রথমদিককার একটি সিনেমা হল হেরিটেজ ঘোষণা দিয়ে সেখানে নানন্দনিক সিনেমা দেখাচ্ছে। এতে করে বর্তমানে ওই সিনেমা হলটি এখন লাভজনক। আর আমরা বসে বসে লাভের আসায় ঐতিহাসিব গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে ধ্বংস করছি। এগুলো অনুর্বর মস্তিষ্কের চর্চা। এরআগে লাভের আশায় ‘গুলিস্তান’ সিনেমা হলটিও ধ্বংস করেছি। এভাবে শিল্প-সাহিত্য বাঁচে না। সরকারকে ঠিক করতে হবে আসলে তারা কি চায়?