ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা প্রশাসন স্কুলে বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি আয় হলেও শিক্ষকদের নামমাত্র বেতন ও দৃশ্যমান ব্যয় মাত্র ৫ লাখ টাকা। বাকি অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ না থাকা, আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং ৩৬ বছরেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো নিবন্ধন না থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
১৯৯০ সালে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরকারি জায়গায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী, শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে ৩০৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শ্রেণিভেদে মাসিক গড়ে ৪৫০ টাকা বেতন নেওয়া হয়, যার বাৎসরিক পরিমাণ প্রায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এছাড়া জানুয়ারি মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা ভর্তি ফি নেওয়া হয়, যা থেকে আয় হয় প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। কেবল বেতন ও ভর্তি ফি মিলেই বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এর বাইরে পুকুর লিজ, দোকানঘর ও দুটি কক্ষ ভাড়া, পুরোনো খাতাপত্র বিক্রি এবং অতিরিক্ত বই বিক্রি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, আটজন শিক্ষক ও একজন আয়ার বেতন বাবদ প্রতি মাসে মাত্র ৪০ হাজার টাকা অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এত আয় থাকার পরও শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেওয়া হয় মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। নামমাত্র বেতনের কারণে যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভাউচার বা লিজের নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষক প্রতিনিধি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো নজরদারি নেই। এসব অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক রোকসানা নূর খান।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির অভাব এবং সরকারি অর্থে নির্মিত টয়লেট নিয়মিত পরিষ্কার না করায় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে সাবেক ইউএনও দবির উদ্দিনের সহযোগিতায় কিছু সংস্কারকাজ হওয়ায় এবং তার হস্তক্ষেপে আর্থিক লেনদেনে কিছুটা শৃঙ্খলা ফেরায় বর্তমানে স্কুলের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা জমা রয়েছে। তবুও আগের বছরগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব এখনও ধোঁয়াশাপূর্ণ।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মুন্সি জাহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রেণিকক্ষগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও টয়লেটগুলো ব্যবহারোপযোগী করা জরুরি। শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানাই।
নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আয়-ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কার্যকর ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য একটি যৌক্তিক ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো চালুর দাবি জানাই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক রোকসানা নূর খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিগগিরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্তে সত্যতা মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, খুব দ্রুত শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি সমাবেশ আয়োজন করা হবে এবং শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত বেতন কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব