হারি মেরদেকা ২০২৬। লাল-সাদা-নীল পতাকার বর্ণিল সাজে সেজেছে মালয়েশিয়া। তূর্যের গম্ভীর ধ্বনি, জাতীয় সংগীত, সামরিক কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা আর আকাশে পতাকা নিয়ে হেলিকপ্টারের উড্ডয়নে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়া। সোমবার নানা আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে মালয়েশিয়ার ৬৯তম স্বাধীনতা তথা জাতীয় দিবস।
১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া। সেই থেকে প্রতিবছর ৩১ আগস্ট ‘হারি মেরদেকা’ বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে দেশটির মানুষ। জাতীয় ইতিহাসে দিনটি গৌরব, আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
জাতীয় দিবস উপলক্ষে সোমবার সকাল থেকেই পুত্রজায়ার দাতারান পুত্রজায়ায় নামে মানুষের ঢল। স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশিও অংশ নেন বর্ণাঢ্য এ আয়োজনে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় শুরু হয় জাতীয় দিবসের মূল অনুষ্ঠান।
মালয়েশিয়ার ৬৯তম জাতীয় দিবসের এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম ও রানি রাজা জারিথ সোফিয়া। সকাল ৮টায় তারা দাতারান পুত্রজায়ায় পৌঁছালে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী দাতুক সেরি ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল। এ সময় যোগাযোগমন্ত্রী দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিলও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২০২৬ সালের জাতীয় দিবস ও মালয়েশিয়া দিবস উদযাপনের মূল কমিটির চেয়ারম্যান।

রাজা-রানির উপস্থিতিতে শুরু হয় জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে দাতারান পুত্রজায়াজুড়ে ভেসে ওঠে তূর্যের গম্ভীর ধ্বনি। এরপর মূল সম্মান রক্ষী বাহিনীর ব্যান্ডদল পরিবেশন করে জাতীয় সংগীত ‘নেগারাকু’। জাতীয় সংগীতের সুরে পুরো প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
এরপর রাজা ও রানি রাজকীয় মঞ্চে আসন গ্রহণ করলে আকাশে শুরু হয় পতাকা প্রদর্শন। মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, সেনাবাহিনী, রাজকীয় নৌবাহিনী ও রাজকীয় বিমানবাহিনীর পতাকা বহন করে পাঁচটি হেলিকপ্টার। পুত্রজায়ার আকাশে হেলিকপ্টারের এ দৃষ্টিনন্দন উড্ডয়ন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে।
পরে রাজা সুলতান ইব্রাহিম কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং মূল সম্মান রক্ষী বাহিনীর কাছ থেকে রাজকীয় অভিবাদন গ্রহণ করেন। সাঙ্গাই বুলোহ ক্যাম্প থেকে আসা আনুষ্ঠানিক রাজকীয় গোলন্দাজ রেজিমেন্টের ৪১তম ব্যাটারি এ অভিবাদন প্রদান করে। এতে তিনজন কর্মকর্তা ও ৫৭ জন সদস্য অংশ নেন।
এবারের জাতীয় দিবসের প্রতিপাদ্য—‘মালয়েশিয়া মাদানি: সমৃদ্ধির সুফল সবার জন্য’। এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জাতীয় ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি ও নাগরিক কল্যাণের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে এবারের আয়োজনে।
বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজে ৭৬টি দলের মাধ্যমে অংশ নিয়েছেন মোট ১০ হাজার ৮১৯ জন। সঙ্গে রয়েছে ২২টি ব্রাস ব্যান্ড। আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, জাতীয় দিবসের এ আয়োজনে ৮০ হাজারের বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে।
তৃতীয়বার রাজা-রানির উপস্থিতি
মালয়েশিয়ার ১৭তম রাজা হিসেবে সুলতান ইব্রাহিম দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তিনি ও রানি রাজা জারিথ সোফিয়া জাতীয় দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজন প্রত্যক্ষ করলেন। ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সুলতান ইব্রাহিম রাজা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং একই বছরের ২০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষিক্ত হন।

রাজা-রানির উপস্থিতি, হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ, সামরিক কুচকাওয়াজ, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা এবং আকাশে পতাকা বহনকারী হেলিকপ্টারের উড্ডয়নে এবারের মেরদেকা উদযাপন পরিণত হয়েছে জাতীয় গৌরব ও ঐক্যের এক বর্ণাঢ্য উৎসবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব
মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা দিবসের এ আয়োজনের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াই প্রথম ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক শ্রমবাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণও বেড়েছে। মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য বলে মনে করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে।
আজকালের খবর/এমকে