ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা এবং তাদের নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের কারণে বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত কমে গেছে। ইউরোপে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর এবং আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস)-এর মজুতও অত্যন্ত সংকটজনক পর্যায়ে নেমে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি ‘অর্ডারস বুক’-এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর তদারকি করেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এসব অস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইউরোপে থাকা প্যাক-৩ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর এবং এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের কাছে ‘বিয়ন্ড ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় মজুত এতটাই কমে গেছে যে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া জানানো কঠিন হতে পারে।
সম্প্রতি এপি-ও ইউরোপে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতিকে ‘বিয়ন্ড ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, রাশিয়ার সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে পেন্টাগন ও ন্যাটো এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত দাবিগুলো ‘ভুল’ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি যদি দ্রুত পূরণ করা না যায়, তাহলে একই সময়ে অন্য কোনও বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষ করে চীনের সঙ্গে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত এবং রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর কোনও সরাসরি সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় এসব সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইউরোপে মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ইউক্রেনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চেয়ে আসছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মজুত পুনর্গঠন না করা পর্যন্ত ইউক্রেনসহ মিত্রদের অতিরিক্ত সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র দ্রুত প্রতিস্থাপন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো মিত্রদেশ থেকে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে মজুত পুনর্গঠন করতে হলেও এতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
এপি জানিয়েছে, ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে বলে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব। প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি ইন্টারসেপ্টরের মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০টি ব্যবহৃত হয়েছে বলে ওই হিসাবের উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ন্যাটোর তথ্যানুযায়ী, জার্মানিতে ইউরোপের প্রথম প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ালেও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেতে সময় লাগবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরাসরি হামলার মাত্রা অনেকটাই কমেছে। তবে যুদ্ধের সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বজায় রাখা এবং অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অস্ত্রের মজুত দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় একযোগে কোনও সংকট তৈরি হলে এই ঘাটতি বড় কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
তবে মার্কিন প্রশাসন বলছে, দেশের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। পেন্টাগনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে চলছে।
তবু ইরান যুদ্ধ যে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে, তা এখন আর শুধু ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ নয়—মিত্রদেশগুলোতেও এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিরোধ কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সূত্র: আল-জাজিরা
আজকালের খবর/বিএস