মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক ছাত্রনেতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টা ২০ মিনিটে মৌলভীবাজার শহরের কাজিরগাঁওস্থ নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় কাজিরগাঁও টিকরবাড়ীর টিলায় তাঁর প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাজনগরের ভাংগারহাট প্রাইমারি স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দুপুর ২টায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
আলাউর রহমান চৌধুরী ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনে মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এছাড়া মৌলভীবাজার জেলা বাকশালের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার এবং সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
রাজনগর উপজেলার ভাংগারহাট গ্রামের সন্তান আলাউর রহমান চৌধুরী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে মৌলভীবাজার সরকারি স্কুল থেকে এসএসসি এবং মৌলভীবাজার কলেজ থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন। এরপর সেন্ট্রাল ল’ কলেজে আইন বিষয়ে পড়াশোনায় ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, আলাউর রহমান চৌধুরী মৌলভীবাজার কলেজের ১৯৬৪ সালের ছাত্র সংসদের মিলনায়তন সম্পাদক ছিলেন। মৌলভীবাজারে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকের শেষভাগে স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার হলে তিনি ছাত্রসমাজের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বস্থানীয় কর্মী হিসেবে তিনি রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করে তিনি ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সংগঠকের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন অনর্গল বক্তা, ভদ্র, সদালাপী ও হাস্যোজ্জ্বল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুসংবাদে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এক শোকবার্তায় মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মান্নান, ফাউন্ডেশনের ফাউন্ডার্স প্রেসিডেন্ট ও গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র কেন্দ্রীয় কনভেনর মোহাম্মদ মকিস মনসুর, সহসভাপতি জয়নাল আবেদিন খান, সাধারণ সম্পাদক এম মুহিবুর রহমান মুহিব ও ট্রেজারার মোহাম্মদ মুজিব মনসুরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
শোকবার্তায় মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরী ছিলেন একজন সৎ, নির্লোভ ও পরোপকারী মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারবাসী আন্দোলন-সংগ্রামের একজন প্রবীণ সহযোদ্ধাকে হারাল। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অবদান স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরীর কর্মময় জীবন, সততা, মানবিকতা ও সমাজসেবামূলক কাজের প্রতি তাঁর নিবেদন মানুষের হৃদয়ে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মরহুমের ছেলে তাসনিম চৌধুরী নাঈম পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর বাবার রুহের মাগফিরাত ও জান্নাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
আজকালের খবর/এমকে