মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬
কূটনৈতিক দরকষাকষিতে মালদ্বীপে ৫০ হাজার ডিপোর্টেশন সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত থাকছে
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৯ পিএম   (ভিজিট : ২৬)
তীব্র আইনি ও কোটাসংক্রান্ত কঠোর অভিবাসন নীতির মুখে মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রায় ৫০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মাথার ওপর ঝুলতে থাকা সম্ভাব্য ডিপোর্টেশনের (গণ-বহিষ্কার) মেঘ অনেকটা কেটে গেছে। 

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জোরালো কূটনৈতিক দরকষাকষি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং মালেস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলামের ধারাবাহিক যোগাযোগের পর মালদ্বীপ সরকার এই সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে। মালদ্বীপ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিভাসন দপ্তর এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দুই দেশের কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশটির সাময়িক এই সিদ্ধান্তে প্রবাসীদের মাঝে যেমনি স্বস্তি ও নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে, তেমনি মালদ্বীপের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে এক নতুন দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক দুয়ার খুলে দিয়েছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথ এশিয়া উইংয়ের কর্মকর্তারা জানান, মালদ্বীপের অভিবাসন নীতি অনুযায়ী এক দেশ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ কর্মী নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, দেশটির স্থানীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশি কর্মীদের দীর্ঘদিনের অবদান অনস্বীকার্য। সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমরা মালদ্বীপ সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, হুট করে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠালে তা কেবল প্রবাসীদের জন্যই মানবিক সংকট তৈরি করবে না, বরং তাদের স্থানীয় পর্যটন ও নির্মাণ খাতও বড় ধাক্কা খাবে। 

তারা আরও বলেন, ‘এই সফল কূটনৈতিক দরকষাকষির ফলেই আপাতত ডিপোর্টেশন স্থগিত রয়েছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য অনিবন্ধিত প্রবাসীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন শ্রমচুক্তি সম্পাদন করা।’

‘এক লাখের’ আইনি সীমা মালের অভিভাসন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মালদ্বীপের বিদ্যমান অভিবাসন নীতি ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখের বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগের ওপর আইনি ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। নির্ধারিত এই সীমা প্রায় ৫০ হাজার অতিক্রম করায় শুধু অনিবন্ধিত বা কাগজপত্রহীন কর্মীই নন, বরং জাতীয়তার কোটা ব্যবস্থাপনার জটিলতায় পড়ে। এতে বৈধভাবে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের অবস্থানও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকটময় এই পরিস্থিতিতে মালেস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলামের প্রারম্ভিক মধ্যস্থতা ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ মূল ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে প্রবাসীদের এই সংবেদনশীল বিষয়টি সমাধানে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা যুক্ত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক মালদ্বীপ সফর এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।

সূত্র বলছে, কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, হুট করে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে ফেরত পাঠালে তা কেবল প্রবাসীদের জন্যই মানবিক সংকট তৈরি করবে না, বরং মালদ্বীপের উদীয়মান অর্থনীতিতেও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি দেশটির সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। 

মালের বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন সূত্রে জানা গেছে, মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত শ্রমনির্ভর। বিশেষ করে সেদেশের সবচেয়ে লাভজনক পর্যটন ও রিসোর্ট শিল্প, অবকাঠামো নির্মাণ খাত, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। কূটনৈতিক বৈঠকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে এই বাংলাদেশি কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকা ও অবদান তুলে ধরা হয়। সফল আলোচনার পর মালদ্বীপ সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে এবং ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এই সাময়িক স্থগিতাদেশ বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতির জন্য একটি বড় সাফল্য হলেও বিষয়টিকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের নীতির জায়গাটিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। 

কূটনীতিকরা বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথাগত অদক্ষ বা সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর বদলে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইটি খাতে প্রশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিতে হবে; অনিবন্ধিত প্রবাসীদের বৈধ কাঠামোর আওতায় আনতে মালদ্বীপ সরকারের সঙ্গে দ্রুত বিশেষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা প্রয়োজন; প্রবাসীদের সুরক্ষায় মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের একটি নির্ভুল ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি করা; পাশাপাশি শ্রমিকদের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানে দুই দেশের প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ডায়লগ চালু রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সাময়িক ডিপোর্টেশন স্থগিত রাখার মাধ্যমে যে কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মালদ্বীপের সঙ্গে একটি সমন্বিত ও টেকসই দ্বিপক্ষীয় শ্রম চুক্তি স্বাক্ষর করাই এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।


আজকালের খবর/ এমকে










Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft