মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গরের শাহ আলমে জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্যানাসনিকের একটি উৎপাদন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রায় ৪০০ কর্মীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারখানাটিতে বাংলাদেশিসহ বিদেশি কর্মী কর্মরত থাকলে তাদের কর্মসংস্থান ও পরবর্তী অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্যানাসনিক বা মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ কর্মীর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি। ফলে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনানুষ্ঠানিক সূত্রের তথ্যকে নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্যানাসনিকের ঘোষণা অনুযায়ী, প্যানাসনিক এভিসি নেটওয়ার্কস কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়া সেন্ডিরিয়ান বেরহাদ (পিএভিসিকেএম)-এর শাহ আলম কারখানায় টেলিভিশন, ব্লু-রে ডিস্ক প্লেয়ার এবং টেকনিক্স ব্র্যান্ডের হাই-ফাই অডিও পণ্য উৎপাদন করা হয়। বৈশ্বিক উৎপাদন কার্যক্রম পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এসব উৎপাদন কার্যক্রম ধাপে ধাপে বন্ধ বা অন্য স্থানে স্থানান্তর করা হবে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, শাহ আলম কারখানায় টেলিভিশন উৎপাদন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বন্ধ হবে। ব্লু-রে ডিস্ক প্লেয়ারের উৎপাদন চীনের একটি প্যানাসনিক গ্রুপ কোম্পানিতে স্থানান্তর করা হবে। অন্যদিকে টেকনিক্স ব্র্যান্ডের হাই-ফাই পণ্যের উৎপাদন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে বন্ধ করে অন্য একটি প্যানাসনিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো কারখানার কার্যক্রম ২০২৭ সালের মার্চের শেষ নাগাদ বন্ধ হওয়ার কথা।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত চাকরি হারানোর পর নতুন কর্মসংস্থান পাওয়ার সুযোগ এবং বৈধভাবে দেশটিতে থাকার বিষয়টি নিয়ে। কারখানাটি বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে চাকরি পরিবর্তন, নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের অনুমতি এবং দেশে ফেরার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো কারখানা কর্তৃপক্ষ, মালয়েশিয়ার শ্রম কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা নেওয়া। বিশেষ করে চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে অভিবাসন ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তায় ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে সেলাঙ্গর রাজ্য সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দাতুক সেরি আমিরউদ্দিন শারি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রাজ্যের মানবসম্পদ ও দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ক এক্সকো ভি পাপ্পারাইডু এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা (পারকেসু)-এর প্রতিনিধিরা।
সরকারের পক্ষ থেকে কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন চাকরির সুযোগ খুঁজে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে খাদ্য সহায়তাসহ প্রাথমিক সহযোগিতাও দেওয়ার কথা জানিয়েছেন রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা।
পাপ্পারাইডু জানিয়েছেন, চাকরি হারানো কর্মীদের জন্য পারকেসু-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীরা চাকরি হারানোর পর নতুন কাজ খোঁজার সময় পর্যায়ক্রমে ভাতা পেতে পারেন। প্রথম মাসে বেতনের ৮০ শতাংশ, দ্বিতীয় মাসে ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে ৩০ শতাংশ হারে এই সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্যানাসনিকের কর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সেলাঙ্গর সরকার ইতোমধ্যে চাকরি মেলার আয়োজন করেছে। মেগা জবকেয়ার সেলাঙ্গর ২০২৬-এ ১৪৭টি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মেলায় ১১ হাজারের বেশি চাকরির সুযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ পদে মাসিক বেতন ৩ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের বেশি। মাই ফিউচার জবস-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ মেলায় ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী চাকরিপ্রার্থীরা অংশ নিতে পারছেন।
প্যানাসনিকের শাহ আলম কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তকে কোম্পানিটি বৈশ্বিক উৎপাদন কাঠামো পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। মালয়েশিয়ায় প্যানাসনিক গ্রুপের অন্যান্য কার্যক্রম অবশ্য অব্যাহত থাকবে। কোম্পানির তথ্যমতে, দেশটিতে প্যানাসিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
তবে শাহ আলমের এই কারখানা বন্ধের ঘটনায় বিশেষ করে বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন করে কর্মসংস্থান, বৈধভাবে চাকরি পরিবর্তন এবং আয়-রোজগার অব্যাহত রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা এখনো প্রকাশ না হলেও, কারখানাটিতে বাংলাদেশি নাগরিক কর্মরত থাকলে তাদের জন্য বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের তালিকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা, তাদের চাকরির ধরন, ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি উঠতে পারে।
আজকালের খবর/বিএস