
যুক্তরাজ্যে ১৫ মাসের বেশি সময়ের চিকিৎসা শেষে গত সোমবার (৩ আগস্ট) দেশে ফিরেছেন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তাকে দেখতে গুলশানে তার বাসায় গিয়েছিলেন কিংবদন্তী অভিনেত্রী শবনম এবং শক্তিমান খলঅভিনেতা মিশা সওদাগর। এদিন অভিনেতা কাঞ্চনের উপস্থিতিতে তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া পড়ান মিশা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাঞ্চনের ছেলে জয়।
তিনি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় আব্বাকে দেখতে এসেছিলেন শবনম আন্টি আর মিশা চাচ্চু। এসময় আব্বার জন্য মিশা চাচ্চু দুইজন হাফেজ দিয়ে দোয়া পড়ান। এসময় তারা পুরানো স্মৃতি রোমন্থন করলে আব্বা তাতে সায় দিয়েছেন আবার কখনো প্রশ্ন করেছেন আরো মনে করার জন্য।
এ ব্যাপারে মিশা বলেন, আমার অভিনয় জীবনে যে ক’জন মানুষ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি তাদের একজন কাঞ্চন ভাই। তার সততা, আধুনিকতা আর কর্মনিষ্ঠায় আমি মুগ্ধ। আমাদের কাছে তিনি অনুকরণীয় এক চরিত্র।
তিনি বলেন, কাঞ্চন ভাই অসুস্থ হওয়ার পর তার সঙ্গে দেখা হয়নি, তবে সবসময় তার ছেলে জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। দেশে থাকতে আমরা উত্তরাবাসী হওয়ার সুবাদে সবসময় দেখা হতো। আমরা একে অন্যের বাসায় যাতায়াত করতাম। তার অসুস্থতার খবরে আমি হতাশ। কারণ তিনি ইন্ডাস্ট্রির এমন একজন অভিভাবক যার প্রভাব অনেক গভীরে। তিনি এমন একজন আইকন যার একক প্রচেষ্টায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন আজ সবার দাবিতে পরিণত হয়েছে। যে কাজ রাষ্ট্র বা সমাজের ছিলো সে কাজ তিনি এককভাবে কাধে তুলে নিজেকে অনন্য স্থানে নিয়ে গেছেন। আর এমন ব্যক্তিকে শুধু কাছে গিয়ে দেখা করলেই হবে না, তার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে সুস্থতার জন্য দোয়াও চাইতে হবে। আমি সে কাজটিই করার চেষ্টা করেছি। আমরা সবাই কাঞ্চন ভাই এবং তার সন্তানদের জন্য দোয়া করবো যেন অচিরেই তিনি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।
অপরদিকে, এদিন সন্ধ্যায় প্রিয় সহকর্মী ইলিয়াস কাঞ্চনের বাসায় ফুল হাতে হাজির হন কিংবদন্তী অভিনেত্রী শবনম।
স্মৃতিচারণার একপর্যায়ে শবনম কাঞ্চনকে মনে করিয়ে দেন সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সহধর্মিণী’ সিনেমার কথা। জবাবে কাঞ্চন হাসিমুখে সায় দেন।

শবনম বলেন, ‘কাঞ্চনের সঙ্গে আমি একটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছিলাম। সেসুবাদে খুব কাছ থেকে ওকে জানি। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। সেটে ও নিজের মতো থাকতে পছন্দ করতো। পর্দায় আমরা মা-ছেলে থাকলেও সেটে ছিলাম ভাবী-দেবর সম্পর্কে। আমাকে খুবই সম্মান করতো। মনে পড়ে দীর্ঘদিন পর গত বছর তিনেক আগে ওর অফিসে একবার দেখা করি, খুব খুশি হয়েছিলো। অনেকক্ষণ সেদিন আমাদের কথা হয়েছিলো।’
“ওর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনটা এখন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেই। এই দাবি এখন সবার। আমরা কাঞ্চনের জন্য যেমন দোয়া করবো তেমনি ওর হাতে গড়া সংগঠনের জন্য শুভকামনা জানাবো”-যোগ করেন শবনম।
এসময় তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে মিশা সওদাগরের শিষ্ঠাচারের প্রশংসাও করেন। বলেন, “আজকাল অনেকেই নিজেকে আলাদা ভাবেন। ভাবনাটাও অমূলক বা দোষের কিছু না, তবে মুরব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাটা যে কোনো পরিবেশের জন্য জরুরি। মিশা সওদাগর একজন গুণী অভিনেতার পাশাপাশি ভালো বাবাও। কাঞ্চনের বাসায় এসে ওর সন্তানের সামনে আমাদের দুইজনকেই পা ছুঁয়ে সালাম করেছে। এটা বোধকরি ওর সন্তানের জন্যও শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। ওদের জন্য শুভকামনা।”
এদিকে, অসুস্থ ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখতে তার বাসায় এসেছিলেন চিত্রনায়ক আলমগীর, সুচন্দা, আনোয়ারা, চম্পা, মুক্তি, রোজিনা দিতিকন্যা লামিয়া। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ১৯ সংগঠন বা শিল্পী সমিতির নেতৃবৃন্দকে অসুস্থ কাঞ্চনের পাশে দেখা যায়নি।
ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে গত বছরের এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসা নিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেখানকার হাসপাতাল ও মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় থেকে চলে তার চিকিৎসা। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের একটি বড় অংশ অপসারণ করলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার সরাতে পারেননি। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তার ব্রেন ক্যানসারের কথা।
অস্ত্রোপচার শেষে শুরু হয় ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা। প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি চলে দ্বিতীয় ধাপে ওরাল থেরাপি। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসায় মধ্যে প্রায় ৬০টির বেশি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে এই অভিনেতাকে। এরপর তিন মাসের প্রথম ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ করে তিনি দ্বিতীয় ধাপের আরও তিন মাসের ওরাল থেরাপি নিয়েছেন। তিন ধাপে সব মিলিয়ে মোট শ খানেক কেমোথেরাপি নিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।
আজকালের খবর/আতে