শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বত্রিশ নম্বরে খানিকক্ষণ: মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পুনর্জম্ম যার
তপন দেবনাথ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৩, ৭:৩৭ PM
ঘুরতে ঘুরতে সেই সিঁড়ির কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। এই সিঁড়িতেই বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে। দেয়ালে এখনো সেই রক্তের দাগ অম্লান। সিঁড়িতে যখন বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে ছিল খুনিরা তখন খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতির শপথ বাক্য পাঠ করানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সারা দেশে কার্ফু জারি করে ঘাতকরা, যারা জীবিত বঙ্গবন্ধুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহসও পেত না, তারা রেডিওতে বার বার ঘোষণা করছে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘোষণা দেশের শান্তি বিনষ্টকারী কোনো দুর্ধর্ষ ক্রিমিনালকে হত্যা করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার ঘোষণা নয়। সেই সময় দেশে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার, ভিডিপি, রক্ষীবাহিনী সবই ছিল। সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন কে. এম শফিউল্লাহ যিনি এখনো জীবিত আছেন আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সকল নির্লজ্জতাকে অতিক্রম করে। জিয়াউর রহমান ছিলেন উপ সেনাবাহিনী প্রধান যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বেশি বেনিফিসিয়ারি। এটা সুনিশ্চিতভাবে একাধিক দালিলিক প্রমাণিত যে, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সকল পরিকল্পনার কথা জানতেন এবং তিনি চাইলেই এ পরিকল্পনা বানচাল করতে পারতেন। বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান কে. এম. শফিউল্লাকে ফোন করে বলেছিলেনÑ ‘তোমার সেনাবাহিনী আমার বাড়ি এটাক করেছে’। তিনি তার কি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? সেনাপ্রধান বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে অন্য বাড়িতে আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখন নিজেকে বাঁচাতে তিনি নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছেন।

ভোর তখন পাঁচটা। জিয়াউর রহমান শেভ করছিলেন। সেনাবাহিনীর আরেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাফায়েত জামিল হাঁপাতে হাঁপাতে জিয়াউর রহমানের কাছে হাজির হয়ে বলেছিলেন, ‘স্যার, প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে।’ জিয়াউর রহমান উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।’ একজন মুসলমানের মৃত্যু সংবাদে আর একজন মুসলমানকে ইন্নালিল্লাহ বলতে হয় সে কথাও ভুলে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের এই উত্তর থেকে আর কোনো তথ্য প্রমাণের দরকার হয় কি যে মিশন সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন এবং মিশন সাকসেসফুল হওয়াতে তিনি পুলকিত ছিলেন। তিনি তখন হিসাব মিলাচ্ছিলেন ক্ষমতায় যেতে আর মাত্র এক সিঁড়ি বাকি আছে। অর্থাৎ কে. এম. শফিউল্লাহ। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, যুদ্ধ বিশারদ জেনারেল এম এ জি ওসমানী সেনাবাহিনী প্রধান কে. এম. শফিউল্লাকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে খুশি হয়ে এই বলে সেলিব্রেট করেছিলেন যে, ‘শফিউল্লাহ তোমার সেনাবাহিনী না নামিয়ে দেশকে তো এক সংঘাতের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলে।’ নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডে এরচেয়ে নিচু রসিকতা আর কী হতে পারে? আশা করি ওসমানী ভণ্ডরা এখন বুঝতে পারবেন আওয়ামী লীগ কেন ওসমানীর ব্যাপারে উদাসীন।

দাঁড়িয়ে আছি সেই সিঁড়ির কাছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহটি পড়েছিল। তাকে এখন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি না বটে কিন্তু হৃদয়ের গভীরে অনুভব করছি জাতির জনককে অবহেলার বিষয়টি। বঙ্গবন্ধুকে দাফন কাফনের কোনো ব্যবস্থা করার আগেই বঙ্গভবনে চলছিল বানরের রুটি ভাগাভাগির নাটক। বাংলাদেশের মানুষ কতটা ক্ষমতালোভী এবং স্বার্থপর তা বঙ্গবন্ধুর এ করুণ মৃত্যু না হলে কোনো দিনই বোঝো যেত না। সে সময় জাতির পিতার রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে রাষ্ট্রপতি হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাণিজ্যমন্ত্রী। দুর্ভাগ্যজনক সত্যি হলোÑ মোশতাক মন্ত্রীসভায় দুজন বাদে অন্য সবাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার সদস্য। খন্দকার মোশতাক ১২ জন মন্ত্রী ও ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে তার মন্ত্রীসভা গঠন করেন। ২৩ সদস্যের এই মন্ত্রীসভার ২১ জনই ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাকশালের ক্যাবিনেট সদস্য। তাদের দপ্তরও খুব একটা পরিবর্তন করা হয়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এরা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আলোয় আলোকিত। বঙ্গবন্ধু ব্যতিত এরা ছিলেন নিভে যাওয়া মোমবাতি। নিথর বঙ্গবন্ধুর দেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে কী করে মন্ত্রীসভায় যোগ দিলেন তা ভেবে কূল পাই না। ক্ষমতার লোভ ছাড়া তাদের দেশ প্রেমের নমুনা কোথায়?

মোশতাক ক্ষমতা গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি পদকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়। উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদউল্লাহ। মোশতাককে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ পড়ানো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এইচ টি ইমাম, যিনি সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। বিভিন্ন সময় ইমাম সাহেব বিভিন্ন টক শো ও বক্তব্যে এই তথ্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তাকে বাসা থেকে ধরে আনা হয়েছিল। তিনি শুধু বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আর শপথ বাক্য পাঠ করান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

যারা ঘৃণা ভরে মোশতাক সরকারের মন্ত্রীত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান তারা হলেনÑ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও ফনী ভূষণ মজুমদার। প্রস্তাব নাকচ করায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ফনী ভূষণ মজুমদার ছাড়া বাকি চার জাতীয় নেতাকে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করে পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশকে কালিমা লিপ্ত করে। যে জেলখানাকে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে ধরা হয়, খুনীরা সেই জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে পৃথিবীতে একমাত্র সংঘটিত ঘটনা হিসেবে জাতিকে কলঙ্কিত করে রেখেছে।

বত্রিশ নম্বরের বিভীষিকা মনে হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিলেও কোনো এক ফাঁকে মন চলে যায় ৩২ নম্বরের বাইরে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারকেই নৃশংসভাবে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তার আত্মীয় পরিজনকেও হত্যা করে। এদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত। বঙ্গবন্ধুর মেজ বোনের বড় ছেলে শেখ ফজলুল হক মণি, শেখ মণির স্ত্রী বেগম আরজু মণি। দু সন্তানের জননী অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণিকে স্বামীর সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। বাংলার মাটি এই নির্মমতাকে সহ্য করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ হওয়ার পর তিনি চারিদিকে ফোন করে কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য না পেয়ে বঙ্গবন্ধু তার প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদকে তার লাল টেলিফোনে তার বাড়ি আক্রমণ হয়েছে জানালে সাথে সাথে কর্নেল জামিল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ির দিকে রওয়ানা দেন। পথে সোবহানবাগ মসজিদের সামনে ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন তিনি জীবনের পরোয়া করেননি। কর্তব্য পালনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। সেনা প্রধান কে. এম. শফিউল্লাহ তার বাহিনীকে মুভ করার হুকুম দিলে সেই অভ্যুত্থান থামানো যেত কিনা যেত তাদের ভূমিকা জাতি দেখতে পারতো। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার যখন হত্যাকাণ্ডের শিকার এবং রাষ্ট্রপতি যেখানে সেনাপ্রধানের সাহায্য চেয়েছিলেন সেখানে কোনো আইন সেনাবাহিনী মুভ করার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে তারা নীরব ভূমিকা পালন করে এখন দার্শনিকের মতো কথা বলে সারা জীবন জাতির সাথে প্রতারণা করা আসছেন।

সেই কালো রাতে আরো হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাতের কনিষ্ঠ কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, তার কনিষ্ঠ পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ল্যাবরেটরি উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবুল হাসনাত, আবদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, তখন তার বয়স ছিল চার বছর। ঢাকায় দাদার বাসায় সে বেড়াতে এসেছিল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে সুকান্ত বাবুই ছিল সর্বকনিষ্ঠ। বঙ্গবন্ধু তার কি হন সেটিও সে হয়তো জানতো না। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ভাইয়ের পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাতও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। যিনি ১৫ আগষ্টে চাচার বাসায় অবস্থান করছিলেন। বরিশালের একটি সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই আবদুল নাঈম খান রিন্টুও হত্যার শিকার হন।

সেই অভিশপ্ত ভোরে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও তার আত্মীয় স্বজনকে নির্বিচারে হত্যা করা ছিল পাখি শিকারের শামিল। একমাত্র কর্নেল জামিল ছাড়া আর কেউ বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য এগিয়ে যাননি। একটি দেশে এক বা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থাকে বলে আমরা জানি এবং সেনাবাহিনীর মধ্যেও নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনী ছিল। এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটানো হলো অথচ গোয়েন্দারা একটু আঁচ করতে পারল না একথা কি বিশ^াসযোগ্য? যদি বিশ^াসযোগ্য হয় তবে এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে সকল গোয়েন্দা সংস্থার লোক চাকরি থেকে পদত্যাগ করে নীতি নৈতিকতার পরিচয় দিতেন। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের অনেক আগে থেকে বলতে গেলে একাত্তরের নয় মাসের মধ্যে কলকাতা থেকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ১৯৭২ সালে জেনারেল জিয়ার যোগসাজসে ফারুক, রশিদ গং আমেরিকান দূতাবাসে সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয়ের নাম করে ঘন ঘন যাতায়াত এবং ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের সাথে সখ্য গড়ে তোলার খবর ছিল প্রায় ওপেন সিক্রেট। প্রশ্ন হলো, দেশের সেনা প্রধান, সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানকে বাদ দিয়ে কোনো মেজরের অস্ত্র ক্রয়ের এখতিয়ার আছে কিনা। সেই সময় কারা কারা কী কারণে ঘন ঘন ক্যান্টনমেন্টে এখতিয়ার বহির্ভূত লোকজন জেনারেল জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতেন সে সকল খবর কীভাবে সেনাপ্রধানের অজানা, তাও একটি রহস্য। সেই সময় রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারবর্গ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপর অর্পিত ছিল, আজ ঘটনার আটচল্লিশ বছর পরও তাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন সকল ঘটনার জন্য বঙ্গবন্ধুই দায়ী ছিলেন এমনকি তার পরিবারবর্গসহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার জন্য তিনি পুরোটাই দায়ী। কর্তব্য কাজে দায়িত্ব এড়ানোর এমন নির্লজ্জতা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।

আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই সিঁড়িটির কাছে যেখানে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ এলাপাথাড়ি পড়ে ছিল। মেজর নুর বঙ্গবন্ধুর বুকে গুলি চালায়। সাথে সাথেই তিনি সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন এবং চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় সেই বজ্র কণ্ঠ। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ দেশের মানুষকে তিনি মুক্ত করেছেন। শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে, নিজ দেশের মানুষের হাতেই সপরিবারে প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তিনি জীবনের পরোয়া করতেন না। মাত্র ৫৫ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে যে কীর্তি রেখে গেছেন- সে কাব্য কোনোদিনই লেখা শেষ হবে না। শুধু আফসোস ক্ষমতার লোভ মানুষকে কতটা নরপশুতে পরিণত করতে পারে?

১৯৭৫ সালের ২৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার মন্ত্রীসভার সর্বশেষ রদবদল করেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী মো. মনসুর আলী আর বাণিজ্যমন্ত্রী খুনী খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এই কথাটুকু দেশের সকলেই জানেন যে রাষ্ট্রপতি মারা গেলে বা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনোভাবে অক্ষম হলে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এটি নির্ধারণ করাই ছিল। এজন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা অনানুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না। রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি উভয়ই যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম হন তখন সংসদের স্পিকার রাষ্ট্র পরিচালনার ভার নিবেন। স্পিকারও যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হন তখন প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন।

১৯৭৫ থেকে ২০২৩। মাঝে চলে গেছে আটচল্লিশ বছর। এই আটচল্লিশ বছর পরে জাতির কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই যে উপরাষ্ট্রপতি স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ সক্ষম থাকা অবস্থায় বাণিজ্যমন্ত্রী কুখ্যাত খন্দকার মোশতাক আহমেদ কীভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন? বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কারণে চলমান সংসদ বাতিল হয়নি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা থাকারও কথা নয়। সংবিধানও অক্ষত ছিল। বঙ্গবন্ধুর ৩০ সদস্যের মন্ত্রীসভায় বঙ্গবন্ধুও মন্ত্রীসভা সদস্য মৎস্য, বন, বন্যা এবং বিদ্যুৎ শক্তি মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকেও সেই রাতে হত্যা করা হয়েছিল। লক্ষ্যণীয় এবং ধিক্কারের বিষয় এই যে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর আওয়ামী লীগ কোনো প্রকার প্রতিবাদ বা কোনো ভাবে সোচ্চার হয়নি। তারা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। যেন কোথাও কিছুই ঘটেনি। সব স্বাভাবিক। তাজউদ্দীন আহমেদকে আগে থেকেই মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে সারাদিন নানা নাটকীয়তার পর বিকেলে মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আমাদর মনে রাখতে হবে যে তখনো বঙ্গবন্ধুর লাশ তার বাড়ির সিড়িতে পড়ে আছে। জেনারেল সফিউল্লাহ বিভিন্ন সময় বলেছেন যে বঙ্গবন্ধুর ফোন পাওয়ার পরপর তিনি মেজর জিয়া ও মেজর সাফায়াত জামিলকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের দিকে সৈন্যসহ মুভ করাতে বলেছিলেন। তারা কেউ তার কথায় কর্ণপাত করেনি। তার আদেশ অমান্য করায় এবং দেশের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি ও পরিবারবর্গের জীবন রক্ষায় সামান্যতম কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে স্বীয় কর্তব্য অবহেলা করেছে তার জন্য সেনাবাহিনী প্রধান তাদের বিরুদ্ধে কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। তাদের কথা বাদ দিলেও তিনি নিজে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? বঙ্গবন্ধু ফোন করে তার সাহায্য চাইলে তিনি বঙ্গবন্ধুকে লাফিয়ে অন্য বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বলেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সেনাপ্রধানের এমন দায়িত্বহীন বালখিল্যতার নজির নেই। এই প্রশ্ন তাকে করাই যেতে পারে যে তিনি নিজে কেন সৈন্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন না? কোন কাপুরুষতা তাকে বাধা দিয়েছিল? নাকি অতি সন্তর্পনে তিনিও ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন? কোনো প্রমাণ না থাকায় ভালো মানুষ সেজে আছেন? বিভিন্ন সময় তিনি বলে বেড়ান যে ক্যু হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও তার বিরুদ্ধে। কোটি জাতিকে আহাম্মক না ভাবলে তিনি তা বলতে পারেন না। সে দিন তো তার কিছুই হয়নি। তিনি তো কিলারদের হাতের কাছেই ছিলেন এবং অকারণে সময় নষ্ট করে মিশন সাকসেস করার সুযোগ দিয়েছেন। কোনোভাবে বঙ্গবন্ধু প্রাণে বেঁচে গেলে সফিউল্লাহ কী জবাব দিতেন? কাজেই বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়াই ছিল তার কাম্য এবং এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি দার্শনিকের মতো বলেছেন যাদের মাথায় এই ধরণের কাজ চাপে তারা তা করেই থাকে। তার দর্শনের মধ্যে এই কথা কেন নেই যে, উদ্যোগ নিলে তাদেরকে থামানোও যেত। 

তিনি সৈন্য নিয়ে ৩২ নম্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন, এই সংবাদ ঘাতকদের কাছে পৌঁছালে তারা নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে পালাতে শুরু করতো-এই কথা জোর দিয়ে বলা যায়। ঘাতকদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার পরিজনকে নিহত করা, সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া নয়। ঘটনাস্থলে ছিল সেনাবাহিনীর একাংশ এবং বরখাস্তকৃত কিছু মেজর। গোটা সেনাবাহিনী ছিল জেনারেল শফিউল্লাহর অধীনে। এরপর ছিল নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার। কোনো জায়গা থেকে একটি কাগজের বাঘের মতো হুংকার দিলেও জাতি জানতে পারতো কেউ না কেউ তো জাতির পিতাকে রক্ষার চেষ্টা করেছে।

তিনবাহিনী প্রধানগণ সশরীরে রেডিও স্টেশনে উপস্থিত হয়ে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। তারা হয়তো বলবেন অস্ত্রের ভয়ে, জীবনের ভয়ে তারা মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। জাতীয় চার নেতার মতো তারা অনিহা প্রকাশ করেছেন এমন প্রমাণ তো পাওয়া যায় না। এরপর ১৪ তারিখ পর্যন্ত যারা বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন ১৫ তারিখ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তাদেরই সহকর্মী বিশ^াসঘাতক একজন মন্ত্রী কী করে নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করে তাদেরকে মন্ত্রী পরিষদে সংযুক্ত করল আর তারা সুবোধ বালকের মতো শপথ নিলেন সেটি এক বিরাট প্রশ্ন। মন্ত্রীত্ব গ্রহণ না করলে হত্যা করা হবেÑ এমন হুমকি তাদের জন্য ছিল? এমন কথা কিন্তু তারা আজ পর্যন্ত কেউ বলেননি। তাদের মধ্যে এখনো অনেকে জীবিত আছেন।

দেশের গোয়েন্দা প্রধান অথর্ব ব্রিগেডিয়ার রইফ রাত ২-৩টার সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের আগাম খবর পান। তিনি কাউকে কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি যদি অন্তত বঙ্গবন্ধু বা সেনাপ্রধানকে একটা ফোন করে খবরটা জানাতেন তাহলে এই অভ্যুত্থান অবশ্যই থামানো যেত। ঘাতকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভোর সাড়ে চারটায়। ভোর সাড়ে ৫টা বা তারও একটু পর কিলিং মিশন শেষ হয়। এই এক ঘণ্টা বা তার একটু বেশি সময় বঙ্গবন্ধু জীবিত ছিলেন, যেহেতু তিনি বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলেছেন। সম্ভবত তিনি সর্বশেষ কথা বলেছেন জেনারেল সফিউল্লার সাথে। জেনারেল জিয়া জেনারেল সফিউল্লাহর কথায় পাত্তা দেননি কারণ তিনি ঘটনা জানতেন। বাধা দিয়ে মিশনে বিঘ্ন ঘটাবেন কেন? বঙ্গবন্ধু নিহত হলে মসনদে আরোহন তার সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বাংলাদেশের উপসেনাপ্রধান হলেও হৃদয়ে লালন করতেন পাকিস্তান। তার অবৈধ শাসনামলে সেসব পাকিস্তান প্রেমের অসংখ্য নজির আছে। সাফায়াত জামিলও ঘটনা আগে থেকেই জানতেন বা বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তিনি মসনদ থেকে আর কত দূরে আছেন, বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আর কয় ধাপ এগোতে পারবেন সেই হিসাব কষতেই ব্যস্ত ছিলেন। যদি তা নাই হবে তবে দেশের রাষ্ট্রপতি  সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে এবং তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিতে বলেছেনÑ তিনি কেন তা পাত্তা দিলেন না?

আলোচনার এই পর্যন্ত এসে প্রতীয়মান হচ্ছে যে দেশের শীর্ষ সশস্র বাহিনী প্রধানগণ- যারা রাস্ট্রপ্রধান ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করকে দায়বদ্ধ ছিলেন তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সেনা কর্তৃক আক্রমণ হওয়ার খবর পাওয়ার পরও কোনো প্রকার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে মীর জাফরের ভূমিকা পালন করেছেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে ঠিক এই ধরনের নাটকই মঞ্চস্থ হয়েছিল।

তপন দেবনাথ : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক।

আজকালের খবর/আরইউ








সর্বশেষ সংবাদ
বইমেলায় ইসরাত জাহান নিরুর ‘৩০ পয়সার ৩ লক্ষ স্মৃতি’
রাশিয়ার পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
মায়ের দাফন শেষে বাড়িতে এলো প্রবাসী ছেলে ও জামাতার লাশ
আমাকে জেলে পাঠাতে পারে: জার্মান গণমাধ্যমকে ড. ইউনূস
প্রবাসী প্রেমিককে সামনে আনলেন অধরা খান
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
শান্ত সীমান্ত পরিস্থিতি, টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচলের দাবি
নোটিশ ছাড়াই ফার্মেসি ভাঙচুর: ইউএনও জকির বিরুদ্ধে মানববন্ধন
সাংবাদিকদের এমপি বানানোর কারণ জানালেন প্রধানমন্ত্রী
বাউবি থেকে বিএ পাশ করলেন ভ্যান চালক হায়দার আলী
বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়েতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ, নিহত ৪
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft