সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ঠিকাদারদের উদ্দেশে তার দেওয়া কড়া হুঁশিয়ারি এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তার এমন আপোসহীন অবস্থানকে স্বাগত জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী হচ্ছে কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় রাখছে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে মুরাদনগরে দায়িত্ব পালনকালে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারির বার্তা দিচ্ছেন উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ।
সম্প্রতি উপজেলার দরিকান্দি-ভাগলপুর সড়কসহ কয়েকটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনে যান তিনি। এ সময় নির্মাণকাজে ত্রুটিপূর্ণ ইট ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি তার নজরে আসে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশনা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে ঠিকাদারদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, তাঁর দায়িত্বে থাকাকালে মুরাদনগরে নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। জনগণের টাকায় নির্মিত অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
এর আগেও উপজেলার একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত শিডিউল অনুসরণ না করা এবং নকশাগত ত্রুটির অভিযোগ সামনে এলে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এই প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট নির্মাণকাজে ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর নিম্নমানের অংশ ভেঙে ফেলে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর এ ধরনের পদক্ষেপ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু নির্মাণকাজের মান নয়, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিয়েও আলোচনায় রয়েছেন কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁর কার্যালয়ে এক রাজনৈতিক নেতার অনাকাঙ্ক্ষিত ও উগ্র আচরণের মুখোমুখি হয়েও তিনি ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও দায়িত্বশীল আচরণ করায় সে সময় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ বলেন, সরকারি উন্নয়নকাজের গুণগত মান বজায় রাখা আমার দায়িত্ব। জনগণের অর্থের অপচয় কিংবা নিম্নমানের কাজের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে ১৯ নং দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামের স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুল মতিন চৌধুরী উপজেলা প্রকৌশলীর কাজের প্রশংসা করে বলেন, আমার বাড়ির সামনের রাস্তাটির নির্মাণকাজ আমি নিজে দেখেছি। কাজের মান ও গুণগত দিক বিবেচনায় আমি শতভাগ সন্তুষ্ট। একজন প্রকৌশলী আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে যে ভালো উন্নয়ন সম্ভব, এই রাস্তাটি তার উদাহরণ। তাঁর মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুরাদনগরে থাকলে এলাকার উন্নয়নকাজ আরও টেকসই ও জনবান্ধব হবে।
এলজিইডির আওতায় গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে উপজেলা প্রকৌশলীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট, বালু, খোয়া, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণের মান, কাজের পরিমাণ, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশল বিভাগের। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং একই অবকাঠামো সংস্কারে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়ক কিংবা কালভার্ট নির্মাণে ত্রুটি ও জনভোগান্তির অভিযোগ উঠলে কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজের মান বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করে অনেকেই বলছেন, সরকারি উন্নয়নকাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ে এমন কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদারদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে কাজের মান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মুরাদনগরের সচেতন মহলের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রকৌশলীর এই কঠোর অবস্থান যেন ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে এবং সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়মের আওতায় আনা হয়। কারণ, সরকারি অর্থ কোনো ব্যক্তি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সেই অর্থে নির্মিত একটি সড়ক, সেতু কিংবা কালভার্ট নিম্নমানের হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই পারে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে।
আজকালের খবর/বিএস