ফিফা আসিয়ান কাপের সেই দুঃস্বপ্নটা এখনও তরতাজা। গত ১ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হারের তিক্ততা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের দুর্বলতা। সেদিন জিদান ইউসুফ, তারিক কাজী, জায়ান আহমেদ, সাদ উদ্দিনরা রক্ষণে ছিলেন ছন্নছাড়া। গোলপোস্টের নিচে মেহেদি হাসান শ্রাবণও পারেননি আস্থার প্রতিদান দিতে। এমনকি ইংল্যান্ড প্রবাসী এবং বাংলাদেশের ফুটবলের পোস্টারবয় হামজা চৌধুরী নিচে নেমেও ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণের ঢেউ সামলাতে পারেননি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে ঘুরেফিরে উঠে আসছে বাংলাদেশের রক্ষণের দুর্বলতার বিষয়টি। বিশেষ করে ৫ নভেম্বর ভুটান ম্যাচে হামজাকে ছাড়া বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ফুটবল-সংশ্লিষ্টরা। রক্ষণের দুর্বলতা কাটাতে দলকে নিয়ে অনুশীলনে খুব সিরিয়াস বাংলাদেশ কোচ থমাস ডুলি। কিন্তু অনেক দিন ধরে ম্যাচ না খেলা তপু বর্মনের ফেরা এবং বিশ্বনাথ ঘোষের নিজেকে হারিয়ে খোঁজাতে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ নিয়ে দুর্ভাবনা ফুটে উঠেছে।
আসিয়ান কাপে ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণভাগের গতি ও ট্যাকটিকসের সামনে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের পুরো সংগঠন ভেঙে পড়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। সেই ম্যাচের পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অপেক্ষায়। রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ও নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষ এখনও পুরোপুরি ফিট নন। সাফের মতো হাই-ভোল্টেজ টুর্নামেন্টে রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান অভিজ্ঞ সেনানীর চোট ও ফিটনেস নিয়ে অনিশ্চয়তা ডুলির রক্ষণাত্মক কৌশলে বড় ফাটল তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ দল যখনই কাউন্টার অ্যাটাকে যাচ্ছে, তখনই বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা খেই হারিয়ে ফেলছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গোলকিপিং পজিশনের দুর্বলতা ও ডি-বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করার ক্ষেত্রে গুরুতর ভুল প্রবণতা।
ভুটানের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই রক্ষণভাগকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি। গতকাল সোমবার কাছে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের দুর্বলতা এভাবেই তুলে ধরেন, ‘আসিয়ান কাপে কিন্তু আমরা ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯ গোল হজম করেছি। সেখান থেকে বুঝতে পারবেন যে, আমাদের রক্ষণে বিশাল একটা সমস্যা আছে। রোনান সুলিভান না থাকায় আক্রমণের যে সমস্যা, সেটা হয়তো আপনি সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু রক্ষণের সমস্যাটা যদি সমাধান না করতে পারেন, তখন বড় সমস্যা হবে। আপনি যদি গোল না খান, তার মানে আপনার হাতে এক পয়েন্ট থাকল, গোল দিতে না পারলেও। কিন্তু আপনি যদি রক্ষণের ভুলে গোল হজম করেন, তখন কিন্তু বেকায়দায় পড়ে যাবেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে, রক্ষণটা বেশ ভোগাবে বাংলাদেশকে।’
চোট কাটিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলে ফিরেছেন তপু বর্মন ও বিশ্বনাথ ঘোষ। এর মধ্যে তপু ক্লাবেও কোনো ম্যাচ খেলেননি। ম্যাচ টাইমিংয়ের ঘাটতি নিয়ে ফিরলেও অভিজ্ঞতার কারণে তপুর কাছ থেকে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছেন এমিলি, ‘তপু ফেরায় রক্ষণে দলের শক্তি বেড়েছে। তপুর কয়েকটি সাফ খেলার অভিজ্ঞতা আছে। ও যদি একটা ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারে, সেটা হয়তো কিছুটা কাভার হবে। তার পরও আমার কাছে মনে হচ্ছে, রক্ষণে আমাদের দুর্বলতা আছে।’
হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা হামজা চৌধুরী পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়ান। দ্রুতই নিচে নেমে রক্ষণভাগে হাল ধরেন শেফিল্ড ইউনাইটেডের এ তারকা। ভুটান ম্যাচে হামজার না থাকাটা দলের জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করেন এমিলি, ‘হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে হামজা প্রথম থেকেই ডিফেন্সটা শুরু করে। যেহেতু ভুটান ম্যাচে সে খেলতে পারবে না, দলের জন্য এটা বড় ধাক্কা।’
হামজার শূন্যস্থান পূরণ করাটা যেমন কঠিন, তেমনি করে জিদান ইউসুফ, জায়ান আহমেদও আছেন ফর্মে। তাদের সঙ্গে সাদ উদ্দিনও ভালো অবস্থায় আছেন। এক সময় ভরসার প্রতীক হয়ে ওঠা তারিক কাজীর সেই ফর্মটা এখন আর নেই। ম্যাচ খেলার জন্য তপু যদি ফিট না হন, তাহলে সাদ ও জিদানের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাবে বাংলাদেশ দলের। ‘ফিট তপু থাকলে ডেফিনেটলি এটা আমাদের দলের জন্য বড় একটা শক্তি। বাট তপু যদি ম্যাচ ফিট না থাকে, তখন কিন্তু এটা একটা বড় সমস্যা হবে দলের জন্য। আপনি দেখেন তপু আর জায়ান শারীরিকভাবে খুবই শক্তিশালী। এত কিছুর পরও আমার মনে হচ্ছে, রক্ষণে আমাদের দুর্বলতা আছেই।’
রক্ষণে যেমন দুর্বলতা, মিডফিল্ডেও বাংলাদেশের দুর্বলতা চোখে পড়েছে এমিলির, ‘রক্ষণের দুর্বলতার আগে আপনাকে দেখতে হবে মধ্যমাঠে আপনি কতটা শক্তিশালী। হামজা বাইরে থাকা মানে আপনার মিডফিল্ডেও কিন্তু দুর্বলতা আছে। ডিফেন্ডিংটা শুরু হয় কিন্তু মিডফিল্ড থেকে। ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন যদি মিডফিল্ড থেকে শুরু করতে পারেন, তাহলে ডিফেন্সের ওপর চাপটা কমে যায়। জামাল, সোহেল রানা বা যারাই আছে, তারা আসলে এই মুহূর্তে জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো কতটা অবস্থানে আছে বা কতটা সক্ষম তারা, তা নিয়ে আমার প্রশ্ন।’
ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচে নামার আগে তিন বিভাগেই বাংলাদেশের সমস্যা আছে বলে মনে করেন এমিলি। ভুটানের বিপক্ষে যদি শুরুতে গোল করতে না পারে বাংলাদেশ, তাহলে চাপে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে ধারণা তাঁর।
আজকালের খবর/ এমকে