প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০১ পিএম (ভিজিট : ৬)
ভদ্র সমাজে ‘অশ্লীল’ ইসমত চুগতাইয়ের ৫ গল্পের বিষয় ভাবনা
দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যে গত কয়েক দশকে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনেক নতুন ও শক্তিশালী লেখকের আবির্ভাব সত্ত্বেও ইসমত চুগতাই গভীরভাবে মুগ্ধ করে চলেছেন। এর একটি বড় কারণ তার ভাষা—যা এতটাই অকপট ও আকর্ষণীয় যে তা আজও পাঠকদের মনে আলোড়ন তোলে বা তথাকথিত ভদ্র সমাজে অস্বস্তির জন্ম দেয়। তার গল্পের বিষয়বস্তুগুলো লেখার সময় যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজও ঠিক ততটাই প্রাসঙ্গিক। গত ২৪ অক্টোবর ছিলো উর্দু ভাষার প্রখ্যাত এই ছোট গল্পকারের প্রয়াণ দিবস।
মার্কসবাদীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসমতা চুগতাই নিজেকে গড়েছেন; যার লেখনির প্রকাশভঙ্গিমায় এসেছে নারীর যৌনতা এবং নারীবাদ, মধ্যবিত্ত কৌলীন্য এবং শ্রেণি সংগ্রামের মত বিষয়গুলো; যা কট্টরবাদী সমাজ আর রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে অবলীলায় তা প্রকাশ করেছেন। বিংশ শতকের তিরিশের দশকে প্রখ্যাত হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচান্দের হাতে গড়া প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনে এই সদস্য যে কারণে তথাকথিত ভদ্র সমাজে আজও ‘অশ্লীল’ সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। যুক্তিতে ইস্পাত কঠিন অনঢ় চুগতাই ‘লিহাফ’ গল্পের জন্য অশ্লীলতার অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি এমন সব বিষয় নিয়ে লেখা চালিয়ে গেছেন; যা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ক্ষয়িষ্ণু নবাবদের বেগম ও স্ত্রীরা, সাধারণ বাজারের যৌনকর্মীরা, কিংবা মধ্যবিত্ত গৃহস্থালির লাজুক গৃহবধূ ও তরুণী পরিচারিকারা শ্রেণি ও বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে নিপীড়নের এক অদৃশ্য সুতো সবাইকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। তারা দমবন্ধ করা পরিস্থিতির শিকার এবং সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। নারী হওয়ার কারণেই তারা নিগ্রহের শিকার, আবার সেই যৌনতাকেই তারা নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
প্রথাগত রীতিনীতি ও সামাজিক অনুশাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামিকে তিনি অত্যন্ত জোরালো ও সুনির্দিষ্টভাবে উন্মোচন করেন। তার সাহিত্যকর্ম অত্যন্ত বিশাল ও বৈচিত্র্যময়; ফলে তার অসংখ্য লেখা থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী কয়েকটি ছোটগল্প এবং সেগুলোতে আলোচিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বৈচিত্র্যসহ সংক্ষিপ্ত তালিকার প্রয়াস বিভিন্ন সময় টাইমস এন্টারটেইনমেন্ট, দ্য ডন, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টেইলর অ্যান্ড ফ্র্যাঞ্চিজ, দ্য হাই এশিয়া হেলাল্ড প্রমুখ পত্রিকায় উঠে এসেছে; যার সংক্ষিপ্ত রূপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
ভদ্র সমাজে ‘অশ্লীল’ ইসমত চুগতাইয়ের ৫ গল্পের বিষয় ভাবনা
১. তিল
মূল বিষয়বস্তু ‘অবাধ যৌনচারী’ নারী ও তাদের ‘হুমকিস্বরূপ’ যৌনতার প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা কলঙ্ক।
‘তিল’ গল্পটি এমন এক শিল্পীর কথা বলে যে গ্রামের নারী রানীর ছবি সফলভাবে আঁকার পর কিছু অর্থ উপার্জনের আশা করে। রানী তরুণী, সুডৌল শরীরের অধিকারিণী এবং কামুকতায় ভরপুর। নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে তার কোনো জড়তা নেই এবং সে সরাসরি বর্ণনাকারীর প্রতি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করে। সে গর্বের সঙ্গে তার স্তনের কাছে থাকা তিলটি প্রদর্শন করে এবং একাধিক যৌনসঙ্গী গ্রহণ করে। এখানে ‘তিল’ একটি শক্তিশালী যৌন প্রতীক হিসেবে কাজ করে। শরীরের অস্তিত্ব ও তার তীব্র শারীরিক সত্তাকে ফুটিয়ে তুলতে ইসমত চুগতাই বারবার আগুন, তৃষ্ণা ও উত্তাপের রূপক ব্যবহার করেছেন।
এটি খেয়াল করা জরুরি যে, এই ভাষাটি যৌনতা থেকে প্রেম বা আবেগকে আলাদা করে দেখলেও যৌন আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বকে খাটো করে না। রানী তার প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে স্পষ্টবাদী এবং তাই তাকে একটি তৃপ্তিময় জীবনযাপন করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, বর্ণনাকারী তার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার চেষ্টা করেন; আর তিনি যত বেশি তা করার চেষ্টা করেন, ততই অতৃপ্ত লালসা ও হতাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে থাকেন।
২. গেন্দা বা গাদা
মূল বিষয়বস্তু : বর্ণ ও শ্রেণিগত নিপীড়ন, বিধবা বিবাহের সামাজিক নিষেধ, বিয়ের আগে গর্ভধারণ এবং নারীদের পারস্পরিক আত্মীয়তা ও সখ্য।
গেন্দা উচ্চবর্ণের এক পরিবারে গৃহকর্মীর কাজ করে। সেই পরিবারেরই এক দাপুটে পুরুষের (‘ভাইয়া’) সাথে স্বল্পস্থায়ী প্রেমের সম্পর্কের পর তার ভাগ্য এক অনিশ্চিত ও সংকটপূর্ণ অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। গেন্দার বিদ্রোহ মূলত দ্বিমুখী—একদিকে সে নিম্নবর্ণের নারী হয়েও উচ্চবর্ণের এক হিন্দু পুরুষের প্রেমে পড়ে, অন্যদিকে সে একজন তরুণী বিধবা যাকে কিনা সমস্ত রকম রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্ক বর্জন করে চলতে হয়।
গেন্দার জীবনের ট্র্যাজেডি বা মর্মান্তিক পরিণতি সত্ত্বেও, বর্ণনাকারী—অর্থাৎ বাড়ির মালিকের তরুণী মেয়ে—গেন্দার সাথে এমন এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলে যা বর্ণ ও শ্রেণির সমস্ত বাধা অতিক্রম করে যায়। এই দুই নারীর বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে নারীদের পারস্পরিক সহাবস্থানের এক জগত পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. ঘরওয়ালি (গৃহকর্ত্রী)
মূল বিষয়বস্তু : নারীর যৌনতা ও কামুকতা; বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির দমনমূলক চরিত্র
চুগতাইয়ের অন্যান্য গল্পের পুরুষ চরিত্রগুলোর মতোই মির্জা এখানে ধার্মিকতার ভান করে। কিন্তু যৌনতার বিষয়ে খোলামেলা ও স্বাধীনচেতা লাজো যখন তার বাড়ির পরিচারিকা হিসেবে আসে, তখন তার আচরণে পরিবর্তন ঘটে। লাজো অত্যন্ত তেজস্বী ও স্পষ্টভাষী; সে যৌনতার দাবি জানাতে দ্বিধা করে না।
গল্পটি কালো রসবোধ ও কামুকতায় ভরপুর। এতে ঈর্ষা, আচ্ছন্নতা এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার মতো মানবিক আবেগগুলোর যথার্থ চিত্রায়ন ঘটেছে। লাজোকে এক ‘ভালো’ নারীতে পরিণত করার বা বশে আনার গৃহকর্তা মির্জার সব চেষ্টাই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। মির্জার চরিত্রের মধ্য দিয়ে ইসমত চুগতাই তথাকথিত ‘ভদ্র’ সমাজের ভণ্ডামিকে উন্মোচিত করেছেন—যে সমাজ একদিকে স্ত্রীদের সতীত্ব বজায় রাখার দাবি জানায়, অথচ পুরুষদের অবাধ পরকীয়া বা ব্যভিচারের সুযোগ দেয়।
গল্পটি কেবল এ কারণেই প্রথা-ভাঙা নয় যে লাজো ‘ধার্মিক’ নারীর চিরাচরিত ভাবমূর্তিকে অস্বীকার করে; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি বিবাহ-প্রতিষ্ঠিত দাম্পত্য সম্পর্কের যৌক্তিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। চুগতাই বিবাহকে এক প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা প্রেম-ভালোবাসার মতো আবেগবর্জিত এবং যার একমাত্র ভিত্তি হলো নারীর যৌনতাকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করা এবং একপত্নীত্বকে মহিমান্বিত করা।
৪. ভোকেশন (পেশা)
মূল বিষয়বস্তু : পতিতাবৃত্তি; ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ নারীর কৃত্রিম বিভাজন; কাজের মর্যাদা
গল্পটি এমন এক নারীর বয়ানে বলা হয়েছে, যে বাইজি বা বারাঙ্গনাদের প্রতি ব্যাখ্যাতীত ঘৃণা ও অবজ্ঞা পোষণ করে। শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য সে গর্ববোধ করে এবং বিয়ের আগে প্রথাগত নৈতিকতা ও সতীত্ব বজায় রাখার নীতিতে বিশ্বাসী ও অভ্যস্ত।
তবে তার মনে গভীর আত্মপরিচয়-সংকট দেখা দেয় যখন একদল তাওয়াইফ (বারাঙ্গনা) তার এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করে। গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়, কারণ এতে ‘আদর্শ’ নারীত্ব ও ‘কলুষিত’ নারীসত্তার—এবং শিক্ষকতার মতো ভালো পেশা ও পতিতাবৃত্তির মতো ‘খারাপ’ পেশার—মধ্যে তীব্র বিভাজনকে তুলে ধরা হয়েছে।
একজন নারী কথকের মাধ্যমে চুগতাই জোরালোভাবে দেখিয়েছেন যে, পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রভাবে নারীরা কীভাবে অন্য নারীদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে শেখে এবং এর ফলে কীভাবে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোটি টিকে থাকে। বর্ণনাভঙ্গির দিক থেকেও গল্পটি অনন্য এবং এর সমাপ্তিতে এক চমকপ্রদ মোড় (টুইস্ট) রয়েছে।
‘লিহাফ’ গল্পের প্রচ্ছদ
৫. লিহাফ (লেপ)
মূল বিষয়বস্তু : সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, সমকামী আবেগ, বিবাহিত জীবনে নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা দমন ও পেডোফিলিয়া (শিশুকামিতা)।
ইসমত চুগতাইয়ের সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত গল্প ‘লিহাফ’ বা ‘লেপ’ (খরযধধভ) প্রকাশের পরপরই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অশ্লীলতার অভিযোগে নিজের লেখার সপক্ষে চুগতাইকে আইনি লড়াই লড়তে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হন। এক শিশুর বয়ানে এই গল্পটি সুন্দরী বেগম জানের মর্মান্তিক জীবনের কথা তুলে ধরে; তার স্বামী তাকে উপেক্ষা করতেন এবং ‘তরুণ, ফর্সা ও ছিপছিপে গড়নের কিশোরদের’ সঙ্গ বেশি পছন্দ করতেন।
বেগম জান এবং তার শ্যামবর্ণের মালিশকারিণী রাব্বুর মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল সমাজ-স্বীকৃত রীতির পরিপন্থী ও নিষিদ্ধ; কারণ এটি নারী-পুরুষের প্রথাগত সম্পর্কের ধারণাকে উল্টে দেয়, নারীকে কামজ সুখে মগ্ন হতে দেখায় এবং লিঙ্গ ও শ্রেণির গণ্ডি অতিক্রম করে। নিন্দিত ও শিকারি-সুলভ মানসিকতার অধিকারী বেগম জানের চরিত্রচিত্রণে গল্পটি যেমন অন্ধকার ও অস্বস্তিকর, তেমনই নারীদের মধ্যে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এবং বিষমকামী বিবাহের দমনমূলক প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।