মঙ্গলবার ● ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পরিচালকের ভূমিকার প্রতিবাদে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অনুষ্ঠান স্থগিত
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম   (ভিজিট : ৫)
প্রকাশকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের একটি নির্ধারিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভা স্থগিত করা হয়েছে। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলনায়তনে বেসরকারি গ্রন্থাগারে অনুদান হিসেবে বই প্রদান ও সরবরাহের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা ‘Book Procurement and Distribution Software’-এর পরিচিতি, পর্যালোচনা ও মতামত সংগ্রহের জন্য এ সভার আয়োজন করা হয়েছিল।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচার ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. জাহেদ উর রহমানের।

প্রকাশকদের অভিযোগ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। এ কারণে তাঁকে ঘিরে প্রকাশকদের প্রতিবাদের মুখে সভাটি স্থগিত করা হয় বলে কয়েকজন প্রকাশক জানিয়েছেন।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আফসানা বেগম  ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি অপসারিত হন।  পরবর্তীকালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মে মাসে তিনি আবার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান।

অপসারণ নিয়েও প্রশ্ন

প্রকাশকদের কয়েকজন দাবি করেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আফসানা বেগমকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর অপসারণের কারণ নিয়ে সে সময় বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়।

তৎকালীন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আফসানা বেগমের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছিল, বই ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত ২০ শতাংশ ‘মন্ত্রী-সচিব কোটা’ বাতিলের উদ্যোগ এবং এ বিষয়ে তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এটিকে তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল, সরকারি সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে নয়।

প্রকাশকদের যত অভিযোগ

সৃজনশীল প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আফসানা বেগমের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রধান অভিযোগগুলোর একটি হলো, জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পক্ষের  প্রকাশকদের  উত্থাপিত বিভিন্ন দাবির বিষয়ে তিনি কার্যকর ভূমিকা নেননি।

প্রকাশকদের  অভিযোগ, তাঁরা যেসব প্রকাশককে জুলাইয়ের গণআন্দোলনের বিরোধী বা আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন জেলা বইমেলায় ওই প্রকাশকদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রকাশকদের দাবি, এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে পরিচালকের দূরত্ব তৈরি হলেও তা কমানোর জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁদের আরও অভিযোগ,  পরিচালক প্রকাশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই  তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট  বিষয়ে  গ্রন্থকেন্দ্রের মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশকদের অংশগ্রহণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কমে যায়।

কয়েকজন প্রকাশকের অভিযোগ, জুনিয়র প্রকাশকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বাকবিতণ্ডাতেও জড়িয়েছেন পরিচালক। তাঁদের ভাষ্য, একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিল।

বই ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়েও প্রকাশকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে আফসানা বেগম গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বই ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটিরও সদস্য ছিলেন। সেখানে বই নির্বাচন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

প্রকাশকদের আরও অভিযোগ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বই ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন বই কত কপি কেনা হয়েছে, কেন একটি বই ২০ কপি এবং অন্যটি ৭০ কপি কেনা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। একই সঙ্গে গত অর্থবছরের বই ক্রয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গ্রন্থকেন্দ্রের ফেসবুক গ্রুপ নিয়েও ক্ষোভ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশকদের জন্য পরিচালিত একটি অনলাইন গ্রুপ থেকে কয়েকজন প্রকাশককে বাদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

প্রকাশকদের অভিযোগ, গ্রন্থকেন্দ্রের ওই গ্রুপে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন বা মতামত দিলে কর্তৃপক্ষের পছন্দ না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকাশককে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা প্রকাশকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত, কাউকে গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়া নয়।

শাহজী প্রকাশনী এবং স্বরবৃত্তের রহমতসহ কয়েকজনকে গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে প্রকাশকেরা এর ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাঁরা এ ঘটনায় সহকারী পরিচালক এনামুল হক ও সুপ্তির ভূমিকা তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।

প্রকাশকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া এবং লিখিত অভিযোগ দাখিলের কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।

বই ক্রয় ও প্রকাশনা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশকদের আরেকটি অভিযোগ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম নিজেও লেখক ও অনুবাদক এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদের প্রতিষ্ঠানের নামে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বই কেনা হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তা নির্ধারিত নিয়ম ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বই ক্রয় কমিটির সদস্যদের তালিকা প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রশ্ন, ‘ক্রয় কমিটি বই কিনেছে’ বলা হলেও সেই কমিটিতে কারা ছিলেন, তাঁদের পরিচয় ও ভূমিকা প্রকাশ করা হয় না কেন।

প্রকাশকদের অভিযোগ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রকাশকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বইয়ের তথ্য ওয়েবসাইটে আপলোডের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের সঙ্গে আগে আলোচনা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের বক্তব্য, বেসরকারি অনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যক্রম এক নয়। ফলে গ্রন্থকেন্দ্রের বই সংগ্রহ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও প্রকাশ্যে জানাতে হবে।

প্রশিক্ষণ ও ‘বই’ পত্রিকা নিয়েও অভিযোগ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কাদের প্রশিক্ষক হিসেবে রাখা হচ্ছে, কোন বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকেরা।

প্রকাশকদের একটি অংশের অভিযোগ, তাঁদের ভাষায় ‘ফ্যাসিবাদী ঘরানার’ প্রকাশকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ঘরানার লেখক ও প্রকাশকদের উপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।

সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’ নামের একটি পত্রিকায় লেখক নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রকাশক। তাঁদের দাবি, জাতীয়তাবাদী লেখকদের লেখা পাঠানোর পরও তা প্রকাশ করা হয়নি। তাঁরা এ বিষয়ে ই-মেইলে লেখা পাঠানোর প্রমাণ প্রকাশ করার কথাও জানিয়েছেন। পত্রিকাটিতে আওয়ামী ঘরানার আলোচিত লেখক মণি হায়দারের লেখা প্রকাশের বিষয়টিও তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

বইমেলার ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ

ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় বইমেলায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রকাশকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, গ্রন্থকেন্দ্রের অব্যবস্থাপনার কারণে মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ মেলার বাজেট বাড়ানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আগ্রহ থাকলেও প্রকাশকদের স্বার্থ ও ক্ষতির বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

প্রকাশকদের অভিযোগ, গত বছরের একুশে বইমেলায় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ বাতিলের দাবি উঠলেও 
 সংশ্লিষ্ট সভায় তাঁদের দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। সভায় আফসানা বেগমের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। 

স্বচ্ছ তদন্তের দাবি

প্রকাশকদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই ক্রয়কমিটির সদস্য নির্বাচন, বই সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা এবং বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

প্রকাশকদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হোক এবং বই ক্রয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ক্রয় কমিটির সদস্যদের পরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ করা হোক।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, ক্রয় কমিটির কার্যবিবরণী এবং সরকারি হিসাবের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকেরা।

আজকালের খবর/ এমকে







আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft